নিউজিল্যান্ডের রাজনীতিতে কয়েক দশক ধরে ন্যাশনাল এবং লেবার পার্টির আধিপত্য বজায় থাকলেও, আসন্ন নভেম্বরের নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটারদের মধ্যে এক গভীর হতাশা ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার পালাবদল দেখে আসা সাধারণ মানুষ এখন প্রথাগত রাজনীতির বাইরে নতুন কোনো বিকল্পের সন্ধানে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। ৭৬ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিক ম্যাটি ওয়াল, যিনি অতীতে লেবার পার্টির সমর্থক ছিলেন, তিনি এখন বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির তীব্র সমালোচনা করছেন। তিনি বলেন, “অতীতে রাজনীতির প্রতি আমি এতটা হতাশ ছিলাম না, যতটা এখন বোধ করছি। ট্রাম্প ২.০, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত উত্থান এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাবের মতো বিষয়গুলো আমাদের সামনে। আমরা কিসের অপেক্ষায় আছি? বিপ্লব নাকি সামাজিক পতন?”
রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও অপরচুনিটি পার্টির উত্থান
সাম্প্রতিক জনমত জরিপ অনুযায়ী, ৫ থেকে ৮ শতাংশ ভোটার এবার ‘অপরচুনিটি পার্টি’কে ভোট দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। এই দলটি এখন পর্যন্ত পার্লামেন্টে কোনো আসন পায়নি, তবুও তাদের নীতিগুলো ভোটারদের আকৃষ্ট করছে। বিশেষ করে ভূমি কর এবং সপ্তাহে ৩৭০ ডলারের ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম বা সর্বজনীন মৌলিক আয়ের প্রস্তাব ভোটারদের মধ্যে বেশ সাড়া ফেলেছে। দলের নেতা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে সমর্থকরা বলছেন, “তিনি বুদ্ধিদীপ্ত, চিন্তাশীল, পরিমিতিবোধ সম্পন্ন এবং বাস্তববাদী। তিনি সাধারণ মানুষের ভাষায় কথা বলেন।”
বাজার-চালিত সমাধান ও নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশা
অকল্যান্ডের ৩৮ বছর বয়সী সাসটেইনেবিলিটি কনসালট্যান্ট এবং দুই সন্তানের জননী ওং, যিনি দীর্ঘ এক দশক লন্ডনে কাজ করার পর ২০২২ সালে নিউজিল্যান্ডে ফিরেছেন, তিনি অপরচুনিটি পার্টির সমর্থক। তার মতে, এই দলটি ‘বাজার-চালিত সমাধান’ (market-driven solutions) এবং প্রমাণ-ভিত্তিক নীতিমালার ওপর গুরুত্ব দেয়, যা একটি নিম্ন-নির্গমন বা লো-এমিশন ভবিষ্যতের জন্য অপরিহার্য। ওং মনে করেন, ভোটাররা এখন আর আগের মতো নির্দিষ্ট কোনো দলের সাথে স্থায়ীভাবে আবদ্ধ থাকতে চান না; বরং তারা নির্বাচনের সময় বিভিন্ন দলের ইশতেহার যাচাই করে সিদ্ধান্ত নিতে পছন্দ করেন।
নির্বাচনী সমীকরণ ও বড় দলগুলোর দুর্বলতা
- ন্যাশনাল পার্টি এবং লেবার পার্টির সম্মিলিত সমর্থন গত ৩০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
- ন্যাশনাল পার্টির জনসমর্থন এখন ২৯ শতাংশের আশেপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে, যা ডানপন্থী জোটের দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে।
- নিউজিল্যান্ডের মিশ্র সদস্য আনুপাতিক (MMP) ব্যবস্থায় ৫ শতাংশের বেশি ভোট পেলে পার্লামেন্টে আসন পাওয়া সম্ভব, যা অপরচুনিটি পার্টির জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে।
- ন্যাশনাল পার্টির নেতা ও প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লুক্সন ইতিমধ্যে অপরচুনিটি পার্টির সাথে কাজ করার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন।
- জরিপ অনুযায়ী, অপরচুনিটি পার্টির ভোটারদের মধ্যে ২০ শতাংশ গত নির্বাচনে ন্যাশনাল, ১৭ শতাংশ লেবার, ১২ শতাংশ গ্রিনস এবং ৮ শতাংশ এনজেড ফার্স্ট পার্টিকে ভোট দিয়েছিলেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ
ম্যাসি ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রিচার্ড শ’র মতে, ভোটাররা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বাধীন। তিনি বলেন, “ভোটাররা এখন আর কোনো দলের প্রতি অন্ধ অনুগত নন। তারা নির্বাচনের সময় বিভিন্ন বিকল্প যাচাই করে দেখেন। ন্যাশনাল এবং লেবার পার্টির মূল ভিত্তি আর কখনোই ৪০ শতাংশে ফিরে আসবে না।” উদাহরণ হিসেবে ডেভিড সিমুরের নেতৃত্বাধীন অ্যাক্ট পার্টির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে, যারা ২০১৭ সালে মাত্র ০.৫ শতাংশ ভোট পেয়েছিল, কিন্তু বর্তমানে ৯ শতাংশ সমর্থন নিয়ে বড় দলগুলোর জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বছর দলটি ন্যাশনাল পার্টির ঠিক পরেই ১.৮ মিলিয়ন ডলার অনুদান সংগ্রহ করেছে।
প্রথাগত রাজনীতির প্রতি অনাস্থা
অন্যদিকে, প্রবীণ ভোটারদের একাংশ এখনো বড় দলগুলোর ওপর আস্থা রাখতে চান। ৭৭ বছর বয়সী ক্রিস্টিন হ্যান্ডস, যিনি ১৯৭২ সাল থেকে লেবার পার্টিকে ভোট দিয়ে আসছেন, তিনি মনে করেন ছোট দলগুলো দেশের জন্য কার্যকর নয়। তিনি বলেন, “আমি ন্যাশনাল বা লেবার পার্টিকেই ভোট দেব, কারণ তারাই দেশের জন্য ভালো। ছোট দলগুলোর নীতিগুলো পাগলামিতে ভরা।” তবে ওয়েলিংটনের ৪১ বছর বয়সী বাসিন্দা জেমা, যিনি আগে গ্রিন পার্টির সমর্থক ছিলেন, তিনি এবার প্রথমবার অপরচুনিটি পার্টিকে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমি বুঝতে পারছি না মানুষ এখন কীভাবে টিকে আছে। এই টিকে থাকার লড়াই-ই আমার ভোটের মূল কারণ।”
ভবিষ্যৎ ও স্থিতিশীলতার দাবি
অপরচুনিটি পার্টির নেতা ওং জানিয়েছেন, জনমত জরিপের ফলাফল তাদের প্রত্যাশার চেয়েও ভালো। ভোটাররা তাকে জানিয়েছেন যে তারা ‘পেন্ডুলাম রাজনীতি’ বা এক সরকার এসে অন্য সরকারের কাজ বাতিল করে দেওয়ার সংস্কৃতিতে ক্লান্ত। ওং-এর মতে, নিউজিল্যান্ডের জলবায়ু আইন, স্বাস্থ্যসেবা অর্থায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের জন্য স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। তিনি দাবি করেছেন যে, তার দল যে কোনো বড় দলের সাথেই কাজ করতে প্রস্তুত, যদি তা দেশের স্বার্থে হয়। নিউজিল্যান্ডের এই রাজনৈতিক অস্থিরতা প্রমাণ করে যে, ভোটাররা এখন আর কেবল প্রথাগত ধারায় বিশ্বাসী নন, বরং তারা এমন এক পরিবর্তনের অপেক্ষায় আছেন যা তাদের দৈনন্দিন জীবনের সংকট নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

