ইরানের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা: ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ কি আদৌ কার্যকর হবে?

ইরান দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বিশ্ব অর্থনীতির মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন। দেশটির ব্যাংকিং ব্যবস্থা, শিপিং, তেল শিল্প এবং সামরিক খাতের ওপর যুক্তরাষ্ট্র আগে থেকেই অসংখ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছে। এই ধারাবাহিকতায় মার্কিন কর্মকর্তারা সম্প্রতি ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ নামে নতুন একটি নিষেধাজ্ঞা কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। তবে ট্রেজারি বিভাগের ‘ইকোনমিক ডি-ডে’ বা অর্থনৈতিক ডি-ডে ঘোষণার মতো এই পদক্ষেপটি বাস্তবে কতটা শক্তিশালী হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক জাস্টিন উলফার্স তার সাবস্ট্যাক নিউজলেটারে লিখেছেন, এই নতুন অভিযানটি নিয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা কঠিন, কারণ এটি মূলত ভবিষ্যতে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার একটি ঘোষণা মাত্র। এর আগে থেকেই ইরান বিশ্ব আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কবলে রয়েছে। দেশটিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট দীর্ঘদিনের।

জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাককোর্ট স্কুল অফ পাবলিক পলিসির ভিজিটিং ফেলো এবং বাইডেন প্রশাসনের সাবেক কর্মকর্তা আয়া ইব্রাহিম বলেন, এই ধরনের নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা এখন কমে আসছে। ৫০ বছর ধরে ইরান অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকলেও দেশটির বর্তমান শাসনব্যবস্থা টিকে আছে। এটি অনেকটা এমন একজন খেলোয়াড়কে শাস্তি দেওয়ার মতো, যাকে আগেই মাঠ থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে।

নতুন এই কর্মসূচির আওতায় ৬০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এছাড়া ইরানের ব্যাংক মেল্লির সব শাখা বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং ইরানের সঙ্গে লেনদেনকারী দেশগুলোর ওপরও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে। ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট সোমবার সতর্ক করে বলেছেন, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতার বাইরে কেউ নেই এবং যারা ইরানের লেনদেনে সহায়তা করবে, তাদের লক্ষ্যবস্তু করা হবে।

তবে চীনের ব্যাংকিং খাতের ওপর সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়ে বেসেন্ট কিছুটা সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। তিনি সরাসরি কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন যে, কেন তিনি বিশ্ব আর্থিক ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মুখে ফেলবেন। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন এই মুহূর্তে চীনের সঙ্গে বড় ধরনের সংঘাত এড়াতে চাইছে। কারণ, বেইজিং পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে বিরল মৃত্তিকা বা রেয়ার আর্থ মিনারেলের সরবরাহ বন্ধ করে দিতে পারে, যা মার্কিন গাড়ি, মহাকাশ গবেষণা এবং সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের জন্য অপরিহার্য।

আয়া ইব্রাহিম সতর্ক করে বলেছেন, অতীতে এই ধরনের সংকট থেকে শিক্ষা নেওয়া হয়েছে যে, এই লিভার বা কৌশলটি টানা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। রেয়ার আর্থ মিনারেলের অভাব হোয়াইট হাউসের জন্য বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে।

গবেষণায় দেখা গেছে, অতীতে নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি। উলফার্স উল্লেখ করেন, কিউবার ওপর ছয় দশকের বেশি সময় ধরে অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতার যে কৌশল যুক্তরাষ্ট্র ব্যবহার করেছে, এটি অনেকটা তেমনই। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে এটি একটি পুরনো নাটকেরই পুনরাবৃত্তি।

এদিকে, ডলার-নির্ভর আর্থিক ব্যবস্থাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের এই প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। টিডি কাওয়েনের ওয়াশিংটন রিসার্চ গ্রুপের ম্যানেজিং ডিরেক্টর জ্যারেট সিবের্গ সতর্ক করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র যত বেশি ডলারের ব্যবহারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে, অন্যান্য দেশ ও ব্যাংক তত বেশি বিকল্প ব্যবস্থার সন্ধানে তৎপর হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন ডলারের আধিপত্যকে দুর্বল করতে পারে।