ঢাকা-নিউইয়র্ক ফ্লাইট চালুর প্রতিশ্রুতি: বাস্তব নাকি কেবলই আশার বাণী?

নিউইয়র্কে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে নিজ দেশের পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে সরাসরি ঢাকা-নিউইয়র্ক যাতায়াত করা প্রায় দুই দশকের একটি দীর্ঘ প্রতীক্ষিত স্বপ্ন। ১৯৯৩ সালে বিমান এই রুটে যাত্রা শুরু করলেও ২০০৬ সালে পর্যাপ্ত যাত্রী থাকা সত্ত্বেও বিশাল লোকসান, পুরোনো ডিসি-১০ উড়োজাহাজের কারিগরি ত্রুটি এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক সংস্থার নানা বাধার মুখে রুটটি বন্ধ করে দিতে হয়। এরপর থেকে গত ২০ বছরে জাতীয় পতাকাবাহী এই সংস্থাটি আর নিয়মিত যাত্রীবাহী বিমান নিয়ে নিউইয়র্কের আকাশে ফিরতে পারেনি।

সম্প্রতি দায়িত্ব নেওয়ার পর ২৩ আগস্ট সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইকাও) অডিটে বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় মান অর্জন করতে পারলে আগামী বছর ঢাকা-নিউইয়র্ক ফ্লাইট চালুর সুযোগ তৈরি হতে পারে। সরকারের পরিকল্পনায় ১০টি উড়োজাহাজ লিজ নেওয়ার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে এই আশার বাণীর বিপরীতে রয়েছে বাস্তবতার কঠিন চ্যালেঞ্জ। মাত্র দুই মাস আগে, ২১ জুন তৎকালীন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম বলেছিলেন, নতুন বোয়িং উড়োজাহাজ পেতে অন্তত পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে এবং সে কারণে ঢাকা-নিউইয়র্ক সরাসরি ফ্লাইট দ্রুত চালুর বাস্তব সম্ভাবনা নেই। একই সময়ে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (ক্যাব) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক জানিয়েছিলেন, ২০২৮ সালের আগে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের নিউইয়র্ক ফ্লাইট চালু হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের এয়ারলাইন্সের নতুন করে ফ্লাইট পরিচালনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হলো যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফএএ) ক্যাটাগরি-১ মর্যাদা অর্জন। বর্তমানে এফএএর আন্তর্জাতিক বিমান নিরাপত্তা মূল্যায়ন ব্যবস্থায় বাংলাদেশ ক্যাটাগরি-২ দেশ হিসেবে তালিকাভুক্ত। এফএএর নিয়ম অনুযায়ী, ক্যাটাগরি-২ মানে হলো সংশ্লিষ্ট দেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তা তদারকি ব্যবস্থা আইকাওর নির্ধারিত আন্তর্জাতিক মান পুরোপুরি পূরণ করতে পারছে না। এই ক্যাটাগরি-১ মর্যাদা অর্জন না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে নতুন বা সম্প্রসারিত অপারেশন পরিচালনার ওপর কঠোর বিধিনিষেধ থাকে।

নিরাপত্তা অডিটের ক্ষেত্রেও রয়েছে দীর্ঘ সময়সীমা। ২০২৬ সালের অক্টোবরে আইকাওর একটি নিরাপত্তা অডিট হওয়ার কথা থাকলেও পূর্ণাঙ্গ সেফটি অডিট নির্ধারিত রয়েছে ২০২৭ সালের অক্টোবরে। অক্টোবরে আইকাও নিরাপত্তা অডিটের ফল ইতিবাচক হলেও ২০২৭ সালের পূর্ণাঙ্গ সেফটি অডিট এবং এফএএর ক্যাটাগরি-১ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগে মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে বাংলাদেশি এয়ারলাইন্সের নিজস্ব উড়োজাহাজ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়মিত ফ্লাইট শুরু করা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়।

এছাড়া ফ্লাইট চালুর বিষয়ে বেশ কিছু মৌলিক প্রশ্নের উত্তর এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। যেমন—কোন উড়োজাহাজে ফ্লাইট পরিচালিত হবে, সপ্তাহে কতটি ফ্লাইট থাকবে, নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি (জেএফকে) বিমানবন্দরে প্রয়োজনীয় স্লট ও অনুমোদনের বর্তমান অবস্থা কী, এফএএ ক্যাটাগরি-১ অর্জনের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা কত এবং এই রুটটি আর্থিকভাবে কীভাবে টেকসই করা হবে—এসব বিষয়ে কোনো স্পষ্ট রূপরেখা এখনো পাওয়া যায়নি। যদিও বিমানের বহরে আধুনিক বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার যুক্ত হয়েছে, তবুও দীর্ঘ ২০ বছরের অভিজ্ঞতা প্রবাসীদের সতর্ক করেছে। তারা কেবল আশ্বাসে বিশ্বাসী নন; বরং এফএএ ক্যাটাগরি-১ অর্জনের বাস্তব অগ্রগতি, উড়োজাহাজ প্রস্তুত থাকা, জেএফকে বিমানবন্দরে স্লট নিশ্চিত হওয়া এবং টিকিট বিক্রির তারিখ ঘোষণার মতো দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখতে চান। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন অনেক প্রবাসীর কাছেই পরিণত হয়েছে এক ধরনের ‘আষাঢ়ে গল্পে’। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আর প্রতিবারই কোনো না কোনো সময় শোনা গেছে, ঢাকা-নিউইয়র্ক রুট আবার চালু হচ্ছে, আলোচনা চলছে, প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে, অনুমোদন মিললেই ফ্লাইট শুরু হবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সর্বশেষ আশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন উঠছে মূলত সরকারেরই আগের বক্তব্যের কারণে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ফলে আগস্টে ‘আগামী জানুয়ারি’ নিয়ে নতুন আশাবাদের সঙ্গে জুনে দেশের বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের দেওয়া সময়সীমার একটি স্পষ্ট অসামঞ্জস্য রয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এখানেই ঢাকা-নিউইয়র্ক রুট ঘিরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাটি সামনে আসে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অর্থাৎ নিউইয়র্ক ফ্লাইটের জন্য শুধু একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বা একটি নতুন উড়োজাহাজই যথেষ্ট নয়।