১৯৭৩ সালে ডলি পার্টন তার দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক অংশীদার পোর্টার ওয়াগনারের সঙ্গে কাজ শেষ করার সময় লিখেছিলেন কালজয়ী গান ‘আই উইল অলওয়েজ লাভ ইউ’। ওয়াগনারের সঙ্গে হিট কান্ট্রি ডুয়েট তৈরির দীর্ঘ অধ্যায় শেষে পার্টন নিজের একক ক্যারিয়ার গড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তিনি ওয়াগনারকে গানটি শুনিয়েছিলেন, যা শুনে তিনি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন এবং পার্টনকে বিদায় জানান।
১৯৭৪ সালের মার্চ মাসে মুক্তি পাওয়া এই গানটি বিলবোর্ড হট কান্ট্রি সং চার্টে শীর্ষস্থান দখল করে। এমনকি এলভিস প্রেসলিও গানটি গাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। তবে পার্টন সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন, কারণ এতে তাকে গানের স্বত্ব বা পাবলিশিং রাইটসের অর্ধেক ছেড়ে দিতে হতো। পরবর্তীতে ১৯৯২ সালের সিনেমা ‘দ্য বডিগার্ড’-এ হুইটনি হিউস্টনের গাওয়া সংস্করণটি পার্টনের জন্য মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার আয় বয়ে আনে।
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নিজের গানের স্বত্ব ধরে রাখার এই সিদ্ধান্ত পার্টনের ব্যবসায়িক দূরদর্শিতার পরিচয় দেয়। তিনি ৩ হাজারেরও বেশি গানের একটি বিশাল ভাণ্ডার গড়ে তুলেছিলেন, যা থেকে নিয়মিত রয়্যালটি আয় হতো। নিজের আর্থিক ও সৃজনশীল নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার এই কৌশলই তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারের মূল ভিত্তি হয়ে ওঠে।
নারী হিসেবে সেই সময়ের কঠোর শিল্পক্ষেত্রে টিকে থাকা ছিল চ্যালেঞ্জিং। তবে নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে পুঁজি করে পার্টন পূর্ব টেনেসির গ্রেট স্মোকি মাউন্টেন থেকে হলিউডের ব্যবসায়িক জগতে নিজের অবস্থান তৈরি করেন। এই সাফল্যের পথ ধরেই পরবর্তীতে ডলিউড থিম পার্কসহ বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে ওঠে।
ব্যক্তিগত জীবনে স্বামী কার্ল ডিনের মৃত্যু এবং নিজের স্বাস্থ্যগত সমস্যা থাকা সত্ত্বেও পার্টন তার ব্যবসায়িক কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছিলেন। ২৫ আগস্ট ৮০ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ১৯৮২ সালে ‘দ্য টেনেসিয়ান’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ন্যাশভিলে একটি বড় সাম্রাজ্য গড়ার স্বপ্ন তার সবসময়ই ছিল। তিনি বলেছিলেন, আমি যা করতে চেয়েছি তা হলো নিজের মালিকানা নিজের কাছে রাখা।
৩৬ বছর বয়সের আগেই পার্টন কসমেটিকস, অন্তর্বাস এবং জুতার নিজস্ব লাইন চালু করেছিলেন। বেলমন্ট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক টিম পোলকের মতে, সেই সময়ে যখন অন্য তারকারা নিজেদের ব্র্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখতেন না, তখন পার্টন ছিলেন একজন পথিকৃৎ। এই নিয়ন্ত্রণই তাকে ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে সিলেক্টিভ বা বাছাই করার সুযোগ করে দিয়েছিল।
পার্টনের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের মধ্যে ছিল ডলিউড পার্কস অ্যান্ড রিসোর্টস, ডানক্যান হাইনসের সঙ্গে বেকিং মিক্স, ডলি ওয়াইনস, পোষা প্রাণীর সরঞ্জাম ‘ডগি পার্টন’ এবং বিভিন্ন সুগন্ধি ও পোশাকের ব্র্যান্ড। ফোর্বসের তথ্যমতে, তার সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ডলার। ২০১৭ সালে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, মানুষ কী চায় তা বোঝার এক সহজাত ক্ষমতা তার ছিল।
১৯৬৭ সালে মাত্র ২১ বছর বয়সে নিজের চাচা বিল ও লুইস ওয়েন্সের সঙ্গে পার্টন তার প্রথম ব্যবসা ‘ওওয়েপার পাবলিশিং কোং’ শুরু করেন। পরবর্তীতে ১৯৭৩ সালে তিনি ফায়ারসাইড স্টুডিওস প্রতিষ্ঠা করেন। তার ব্যবসায়িক প্রভাব টেনেসিতে ‘ডলি পার্টন ইফেক্ট’ নামে পরিচিতি পায়।
পার্টন একজন বড় মাপের সমাজসেবীও ছিলেন। ডলিউড ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে তিনি হাজার হাজার শিক্ষার্থীর জন্য স্কলারশিপের ব্যবস্থা করেছেন। এছাড়া ইমাজিনেশন লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা এবং ২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারীর সময় মডার্না ভ্যাকসিন গবেষণায় ১ মিলিয়ন ডলার অনুদান দিয়েছিলেন। ২০২৪ সালে হারিকেন হেলেনের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায়ও তিনি ১ মিলিয়ন ডলার দান করেন।
বেলমন্ট ইউনিভার্সিটির পাবলিক রিলেশনস বিভাগের অধ্যাপক কেভিন ট্রোব্রিজ বলেন, পার্টনের প্রভাব কেবল অর্থনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, তা মানুষের হৃদয়েও জায়গা করে নিয়েছিল। তিনি বলেন, ডলি পার্টনের গল্প আমাদের সবার গল্প। তিনি কেবল একজন শিল্পী ছিলেন না, বরং সমাজ ও মানুষের কল্যাণে কীভাবে ব্যবসা গড়ে তুলতে হয়, তা তিনি জানতেন।
পার্টনের প্রয়াণে তার ভক্ত ও অনুসারীরা গভীরভাবে শোকাহত। ট্রোব্রিজ উল্লেখ করেন যে, ডলি পার্টনের ব্র্যান্ডটি ছিল তার নিজেরই প্রতিফলন, যা তাকে সবার কাছে অনন্য করে তুলেছিল।
