যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চলমান সংঘাত নিরসনের জন্য নির্ধারিত দুই মাসের কূটনৈতিক সময়সীমা সোমবার কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়েছে। এই পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম প্রতি ব্যারেল ৯১.৬৩ ডলারে লেনদেন হয়েছে, যা ৩০ জুলাইয়ের পর প্রথমবারের মতো ৯০ ডলারের সীমা অতিক্রম করল।
ফক্স নিউজের সাথে এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে উদ্দেশ্য করে কঠোর ভাষায় বলেন, তেহরানের উচিত এখন “আত্মসমর্পণের সাদা পতাকা” তুলে ধরা। একই সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ওমানকে সরাসরি হুমকি দিয়ে বলেন, তার শান্তি প্রচেষ্টার পথে ওমান যদি বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তবে তাদের ওপর বোমা হামলা চালানো হবে। এটি দ্বিতীয়বারের মতো মার্কিন এই কৌশলগত মিত্রের প্রতি ট্রাম্পের এমন আক্রমণাত্মক হুমকি।
আইজি প্ল্যাটফর্মের সিনিয়র টেকনিক্যাল অ্যানালিস্ট অ্যাঞ্জিলিন ওংয়ের মতে, ওমানের ওপর ট্রাম্পের এই হুমকি তেলের বাজারকে একটি সাময়িক অস্থিরতা থেকে দীর্ঘমেয়াদী সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে। তিনি আরও বলেন, মাস্কাট যদি তেহরানের সাথে আলোচনা থেকে সরে আসে, তবে হরমুজ প্রণালী দিয়ে স্বাভাবিক তেল সরবরাহ পুনরুদ্ধারের কূটনৈতিক পথ আরও সংকুচিত হয়ে পড়বে। বৈশ্বিক সমুদ্রপথে তেল পরিবহনের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এই প্রণালী দিয়ে সম্পন্ন হয়, তাই সেখানে যেকোনো উত্তজনা তেলের দামের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।
মঙ্গলবার ভোরে হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাওয়ার সময় একটি কার্গো জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে ইউকে মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস এজেন্সি। এর আগে ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল যে, তারা সামরিকভাবে “পুরোপুরি আক্রমণাত্মক” অবস্থানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফক্স নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের সামরিক মুখপাত্র ইব্রাহিম জুলফিকারি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, প্রণালী দিয়ে অতিক্রমের চেষ্টাকারী জাহাজগুলোর গায়ে “সুন্দর কয়েকটি ছিদ্র” তৈরি করা হবে।
জাহাজ ট্র্যাকিং কোম্পানি কেপলারের তথ্যমতে, সোমবার মাত্র ছয়টি পণ্যবাহী জাহাজ এই জলপথ ব্যবহার করেছে। এর আগের শনি ও রবিবার দুই দিনে মোট পাঁচটি জাহাজ চলাচল করেছিল। ডয়েচে ব্যাংকের বিশ্লেষকদের মতে, তেলের এই মূল্যবৃদ্ধি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হরমুজ প্রণালী দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কার প্রতিফলন।
সংঘাত শুরুর প্রায় ছয় মাস পার হলেও তা শেষ করতে হিমশিম খাচ্ছেন ট্রাম্প। সোমবারের সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন যে, চুক্তি করার জন্য তিনি “তাড়াহুড়ো করছেন না” এবং ইরানের ওপর কোনো নতুন সময়সীমাও আরোপ করবেন না। তিনি বলেন, “আমার কোনো সময়সূচী নেই। আমি তাড়াহুড়োর মধ্যে নেই।” অথচ বিগত মাসগুলোতে তিনি বারবার দাবি করে আসছেন যে যুদ্ধ “শীঘ্রই” শেষ হবে, যদিও বাস্তবে তেমন কোনো অগ্রগতির দেখা মেলেনি।
আলপাইন ম্যাক্রোর প্রধান ভূ-রাজনৈতিক কৌশলবিদ ড্যান আলামারিউ সতর্ক করে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত অব্যাহত থাকলে জ্বালানি তেলের বাজারে রাশিয়ার ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে “ডাবল হোয়ামি” বা দ্বিমুখী আঘাত আসতে পারে। তিনি জানান, সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বরের মধ্যে উত্তজনা বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে, যা জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের ধাক্কা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র হলে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম এবং অস্থিরতা আরও বাড়বে। যদিও দুটি যুদ্ধের এই সংমিশ্রণকে বর্তমানে একটি ‘টেইল রিস্ক’ বা কম সম্ভাবনার ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে, তবুও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে জ্বালানি বাজারের ঝুঁকি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

