নেপাল ও তিব্বত সীমান্তবর্তী দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে বুধবার এক ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে। এতে এখন পর্যন্ত অন্তত ৯৫ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। দুর্যোগের তীব্রতা এতটাই প্রকট ছিল যে, নদীর গতিপথ আটকে গিয়ে কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের এক বিশাল স্রোত জনবসতি ও অবকাঠামোর ওপর দিয়ে বয়ে যায়। এই বিপর্যয়ে এখন পর্যন্ত ৩৮৪ জন পর্যটকের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না, যাদের মধ্যে ২৯১ জনই বিদেশি নাগরিক। নিখোঁজ পর্যটকদের তালিকায় যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া ও যুক্তরাজ্যের নাগরিকরা রয়েছেন বলে নেপালের পর্যটন বোর্ড নিশ্চিত করেছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সীমান্তের ওপারে তিব্বতের গিরং এলাকায় এই দুর্যোগের প্রভাবে তিনজন নিহত হয়েছেন এবং ২৬৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তিব্বতের শিগাতসের ট্রাফিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভূমিধসের কারণে ওই এলাকার সড়কগুলো চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। সিসিটিভির ভিডিও ফুটেজে তীব্র স্রোতের সঙ্গে গাছপালা ও ধ্বংসাবশেষ ভেসে যেতে দেখা গেছে। নেপাল ও চীন উভয় প্রান্তেই উদ্ধারকর্মীরা নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, তবে দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান ও ক্ষতিগ্রস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে।
নেপালের পর্যটন বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, নিখোঁজ পর্যটকদের সংখ্যা ৩৮৪ জন, যার মধ্যে ২৯১ জন বিদেশি। এই কঠিন সময়ে বাংলাদেশ নেপালের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী এই বিপর্যয়ে গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করেছেন। নেপাল সেনাবাহিনী হেলিকপ্টার ও দুর্যোগ মোকাবিলা কর্মী মোতায়েন করেছে এবং নদীর স্রোতে আটকা পড়া মানুষকে উদ্ধারে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হচ্ছে। নদীর তীরবর্তী বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
দুর্যোগের সুনির্দিষ্ট কারণ অনুসন্ধানে কাজ করছেন বিশেষজ্ঞরা। কাঠমান্ডুভিত্তিক আন্তর্জাতিক পর্বত উন্নয়ন গবেষণা সংস্থা (ICIMOD) প্রাথমিক মূল্যায়নে জানিয়েছে, নেপালের অংশে পাথুরে বরফধসে লেন্দে নদীর গতিপথ আটকে গিয়ে এই আকস্মিক প্রবল স্রোতের সৃষ্টি হতে পারে। সংস্থাটির রিমোট সেন্সিং ও ভৌগোলিক তথ্য বিশ্লেষক সার্থক শ্রেষ্ঠ জানিয়েছেন, চীন সীমান্তের দিকে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে কোনো অস্বাভাবিকতা পাওয়া না গেলেও নদীর উজানে এখনো প্রতিবন্ধকতা রয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আইসিআইএমওডি-এর জলবায়ু ও পরিবেশ ঝুঁকি বিভাগের প্রধান চিয়াংগং ঝাং নতুন করে বন্যার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। তিনি জানান, নেপাল-চীন সীমান্ত নদীর উজানে এখনো ধ্বংসাবশেষের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়ে আছে, যা যেকোনো সময় ভেঙে পড়ে দ্বিতীয় দফায় বন্যার সৃষ্টি করতে পারে। এই আশঙ্কার কারণে উদ্ধার অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি স্থানীয়দের সতর্ক অবস্থানে থাকতে বলা হয়েছে।
বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ওপরও এই দুর্যোগের প্রভাব পড়েছে ব্যাপক। নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, জলবিদ্যুৎ ও সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র মিলিয়ে প্রায় ৪৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে এবং সঞ্চালন লাইনগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া বেশ কয়েকটি মহাসড়ক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দুর্গত এলাকায় ত্রাণ ও উদ্ধারকারী দল পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে জানান, মুহূর্তের মধ্যে নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়ে বাড়িঘর ও রাস্তাঘাট তলিয়ে যায়। ত্রিশূলী বাজারের বিভিন্ন ছবিতে দেখা গেছে, বাড়িঘরের কেবল ওপরের অংশ কাদার ওপর জেগে আছে। রাজু ভাদেল নামক এক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, তার পরিবারের সদস্যরা এই বন্যায় চরম আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন।
দক্ষিণ এশিয়ায় জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বর্ষাকাল হলেও এবারের দুর্যোগের তীব্রতা বিজ্ঞানীদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে হিমালয় অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং হিমবাহের দ্রুত পরিবর্তনের কারণে চরম আবহাওয়ার ঘটনা বাড়ছে। তিব্বত থেকে উৎপন্ন ভোতে কোশি নদী নেপালে প্রবেশ করে ত্রিশূলী নদীতে মিশেছে, যা এই অঞ্চলের জন্য ভৌগোলিকভাবেই ঝুঁকিপূর্ণ। গত বছরও জিরং বন্দরের কাছে ভূমিধসের ঘটনায় ১৭ জন নিখোঁজ হয়েছিলেন, যা এই অঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী ঝুঁকিরই প্রতিফলন।
বর্তমানে উদ্ধারকর্মীরা একদিকে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে তল্লাশি চালাচ্ছেন, অন্যদিকে নদীর তীরবর্তী এলাকাগুলো থেকে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে। উজানে প্রতিবন্ধকতা রয়ে যাওয়ায় নতুন বন্যার শঙ্কা কাটছে না। নেপাল ও চীনের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ নিরূপণে কাজ করছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় নেপাল পুলিশ ও সেনাবাহিনী সমন্বিতভাবে কাজ করছে। উদ্ধার অভিযানের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও বিদ্যুৎ লাইন মেরামতের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। তবে প্রতিকূল আবহাওয়া ও দুর্গম পাহাড়ের কারণে উদ্ধারকাজ কতদিন চলবে তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
আন্তর্জাতিক মহল এই দুর্যোগে নেপাল ও চীনের পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পর্যটকদের দেশগুলোর দূতাবাসগুলোও নেপাল সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনরা এখন কেবল একটি খবরের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন।
সব মিলিয়ে, নেপাল-তিব্বত সীমান্তের এই বিপর্যয় জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি ও পাহাড়ি অঞ্চলের ভঙ্গুর অবকাঠামোর এক করুণ চিত্র তুলে ধরেছে। উদ্ধার অভিযান ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়া এখন স্থানীয় প্রশাসনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ৩৮৪ পর্যটক নিখোঁজ, তাঁদের ২৯১ জন বিদেশি; তিব্বতেও নিহত ৩, নিখোঁজ ২৬৫ — নদীর গতিপথ আটকে হঠাৎ নেমে আসে কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দুর্যোগের প্রায় আট ঘণ্টা পরও ৩৮৪ পর্যটকের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: নেপালে আকস্মিক বন্যা–ভূমিধসে নিহত ১৫৭, নিখোঁজ ৪০৩। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দুই দেশের সীমান্তঘেঁষা এই দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে দুর্যোগের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে অনেক জায়গায় উদ্ধারকাজও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এই ব্যাখ্যা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ঘটনাটি সাধারণ বর্ষার বন্যার মতো ছিল না।

