হিথ্রো বিমানবন্দরের সম্প্রসারণে হুমকির মুখে ইংল্যান্ডের ৬০০ বছরের পুরনো ঐতিহাসিক নিউ বার্ন

ইংল্যান্ডের হারমন্ডসওয়ার্থে অবস্থিত ৬০০ বছরের পুরনো নিউ বার্ন বা গ্রেট বার্নটি বর্তমানে চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে। হিথ্রো বিমানবন্দরের প্রস্তাবিত সম্প্রসারণ প্রকল্পের ফলে বিমান চলাচলের তীব্র কম্পনে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি “শেকে টুকরো টুকরো” হয়ে যেতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন। ১৪২৬ সালে নির্মিত এই স্থাপনাটি ইংল্যান্ডের টিকে থাকা বৃহত্তম মধ্যযুগীয় কাঠের কাঠামো হিসেবে পরিচিত। স্থাপনাটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। প্রায় ৬০ মিটার দীর্ঘ, ১২ মিটার প্রশস্ত এবং ১১ মিটার উঁচু এই ভবনে ১৩টি বিশাল ওক কাঠের ট্রাস রয়েছে যা ছাদকে ধরে রেখেছে। বিখ্যাত কবি স্যার জন বেটজেম্যান এর বিশালতা ও পরিবেশের কারণে এটিকে একটি ক্যাথেড্রাল বা গির্জার সাথে তুলনা করেছিলেন। বর্তমানে এর ৯৫ শতাংশেরও বেশি কাঠামোগত উপাদান আদি অবস্থায় টিকে আছে, যা একে অত্যন্ত বিরল করে তুলেছে।

ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও বর্তমান সংকট

২০১১ সালে ইংলিশ হেরিটেজ এই বার্নটি কিনে নেয় এবং বর্তমানে এটি সংরক্ষণের জন্য কাজ করছে। আগামী ৫ সেপ্টেম্বর ইংলিশ হেরিটেজ এবং ফ্রেন্ডস অফ দ্য গ্রেট বার্ন যৌথভাবে এই বার্ন ও পার্শ্ববর্তী সেন্ট মেরি গির্জায় একটি বড় সম্মেলনের আয়োজন করেছে। তবে হিথ্রো বিমানবন্দরের তৃতীয় রানওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা এই স্থাপনার অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে। সাধারণ জনগণ ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই সম্প্রসারণ প্রকল্পের বিরুদ্ধে আপত্তি জানানোর সুযোগ পাচ্ছেন। প্রত্নতাত্ত্বিক বিজ্ঞানী ও স্টপ হিথ্রো এক্সপ্যানশন ক্যাম্পেইনের চেয়ারপারসন জাস্টিন বেলি সতর্ক করেছেন যে, বিমানবন্দরের সম্প্রসারিত সীমানা এই বার্ন থেকে মাত্র কয়েকশ মিটার দূরে অবস্থিত, যা বিমান উড্ডয়নের সময় সৃষ্ট কম্পনে স্থাপনাটিকে ধ্বংস করে দিতে পারে।

প্রযুক্তিগত ও পরিবেশগত উদ্বেগ

  • বার্নটি ১৪২৬ সালে নির্মিত হয়েছিল এবং এর নির্মাণকাল ও কাঠ কোথা থেকে আনা হয়েছিল তা ঐতিহাসিক নথিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।
  • স্থাপনাটির ৯৫ শতাংশেরও বেশি কাঠামোগত উপাদান মূল অবস্থায় টিকে আছে, যা মধ্যযুগীয় স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন।
  • লংফোর্ড গ্রামের বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন যে, বিমানবন্দরের বর্তমান রানওয়ের কম্পন তাদের বাড়ির মেঝে পর্যন্ত কাঁপিয়ে দেয়, যা বার্নের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
  • ক্রিশ্চিয়ান হিউজ নামক একজন স্থানীয় বাসিন্দা জানিয়েছেন, বিমানবন্দরের কম্পনের কারণে তার ২০০ বছরের পুরনো বাড়িতে ফাটল দেখা দিয়েছে।
  • হিথ্রো কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, তারা স্থানীয় সম্প্রদায়ের সাথে কাজ চালিয়ে যাবে এবং ভবিষ্যতে জনপরামর্শের সুযোগ দেবে।
  • পরিবহন বিভাগ (DfT) জানিয়েছে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে পরিবেশ ও ঐতিহ্যের ওপর প্রভাবসহ সব বিষয় সতর্কতার সাথে বিবেচনা করা হবে।

জাস্টিন বেলি আরও অভিযোগ করেন যে, সরকার হিথ্রো সম্প্রসারণকে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে ঘোষণা করে পরিবেশগত ও জলবায়ু সংক্রান্ত আইনগুলোকে উপেক্ষা করছে। তার মতে, এটি দুটি গ্রামকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করে দেবে এবং অন্য গ্রামগুলোকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলবে। প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামও অতীতে এই প্রকল্পের সমালোচনা করে বলেছিলেন যে, এটি লন্ডনের বাইরে অবকাঠামোগত বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি রক্ষা করা কঠিন হলেও অসম্ভব নয় বলে মনে করছেন আন্দোলনকারীরা। তারা দাবি করছেন, যদি হিথ্রো কর্তৃপক্ষ কম্পন ও শব্দের মাত্রা সঠিকভাবে পরিমাপ করত, তবে এই বার্নের জন্য অনেক আগেই সতর্কবার্তা উঠে আসত। এখন দেখার বিষয়, সরকারি পরামর্শ প্রক্রিয়ায় এই ঐতিহাসিক স্থাপত্যের সুরক্ষায় কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়।