বিশ্বের প্লাজমা সরবরাহের মূল উৎস যুক্তরাষ্ট্র: চীনের ওপর নির্ভরশীলতার ঝুঁকি ও সংকট

চীনের হেনান প্রদেশের বাসিন্দা ৪৪ বছর বয়সী গে লান যখন তার মায়ের শিরায় প্লাজমা থেকে তৈরি হিউম্যান অ্যালবুমিন প্রবাহিত হতে দেখেন, তখন প্রতিটি ফোঁটার ওজন যেন তার ওপর চেপে বসে। পাকস্থলীর ক্যানসারের অস্ত্রোপচারের পর মায়ের সুস্থতার জন্য এই অ্যালবুমিন অপরিহার্য ছিল। গে লান বলেন, “আমি শুধু আশা করি তিনি দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবেন। টাকার চিন্তা আমাকে তাড়া করে, কিন্তু আমার কোনো উপায় নেই।” দুই মাসে তার মায়ের ৭২টি বোতল প্রয়োজন হয়েছে, যার খরচ গে লানের সাত মাসের আয়ের সমান। বোনের সাহায্য ছাড়া এই চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া তার পক্ষে অসম্ভব ছিল।

প্লাজমা সরবরাহে বৈশ্বিক ভারসাম্যহীনতা

চীন বিশ্বের বৃহত্তম হিউম্যান অ্যালবুমিন ব্যবহারকারী দেশ। এটি প্লাজমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিন, যা অস্ত্রোপচার ও বিভিন্ন জটিল রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। তবে চীন দীর্ঘকাল ধরে প্লাজমার অভ্যন্তরীণ ঘাটতিতে ভুগছে। এর প্রধান কারণ নব্বইয়ের দশকের একটি ভয়াবহ এইচআইভি সংক্রমণ কেলেঙ্কারি, যার ফলে প্লাজমা সংগ্রহের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। বর্তমানে চীন তার চাহিদার একটি বড় অংশের জন্য প্রধান ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের মোট প্লাজমার প্রায় ৭০ শতাংশ সরবরাহ করে এবং এটি বিশ্বের হাতেগোনা কয়েকটি দেশের মধ্যে একটি, যেখানে রক্তদাতাদের অর্থ প্রদান করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের প্লাজমা শিল্প ও দাতাদের বাস্তবতা

যুক্তরাষ্ট্রের প্লাজমা শিল্প মূলত নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর নির্ভরশীল। ২৫ বছর বয়সী স্কাই টাকার নামের একজন শিক্ষার্থী জানান, তিনি সাত বছর ধরে সপ্তাহে দুবার প্লাজমা বিক্রি করেছেন। তিনি বলেন, “আমি জানি এটি জীবন বাঁচাতে পারে, কিন্তু বেশিরভাগ সময় আমি ভাবি যে পরের বেলার খাবার জুটবে কি না বা আমার বিড়ালদের খাওয়াতে পারব কি না।” ক্যাথলিন ম্যাকলাফলিনের ২০২৩ সালের বই ‘ব্লাড মানি’ অনুযায়ী, প্লাজমা দাতাদের মধ্যে অধিকাংশই ৩৫ বছরের নিচে, বেকার এবং কলেজ ডিগ্রিহীন। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্যের সহযোগী অধ্যাপক শি চেন বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি দরিদ্রদের এমন কাজ করতে বাধ্য করে যা তারা স্বাভাবিক অবস্থায় করত না।”

চীনের অভ্যন্তরীণ সংকট ও ঝুঁকি

২০২৪ সালের এক গবেষণা অনুযায়ী, চীনের অ্যালবুমিন বাজারের ৬০ শতাংশেরও বেশি বিদেশি নির্মাতাদের দখলে এবং এর পুরোটাই যুক্তরাষ্ট্রের সংগৃহীত প্লাজমা থেকে তৈরি। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বা বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সংকটের কারণে যদি এই সরবরাহ ব্যাহত হয়, তবে চীনের রোগীরা ভয়াবহ ওষুধ সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির মুখে পড়বে। শি চেন বলেন, “এ কারণেই চীন তাদের অভ্যন্তরীণ প্লাজমা সংগ্রহের সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।” ২০২৩ সালে চীন নতুন ডজনখানেক প্লাজমা সংগ্রহ কেন্দ্র চালু করলেও এখনো প্রতি বছর প্রায় ৬,০০০ টন প্লাজমার ঘাটতি রয়ে গেছে।

নব্বইয়ের দশকের সেই ট্র্যাজেডি

চীনের এই ঘাটতির পেছনে রয়েছে নব্বইয়ের দশকের সেই ভয়াবহ স্মৃতি। তৎকালীন হেনান প্রদেশে অর্থনৈতিক উন্নতির আশায় প্লাজমা সংগ্রহের হিড়িক পড়েছিল। “হাত প্রসারিত করো, শিরা দেখাও; একবার মুষ্টিবদ্ধ করো, ৫০ ইউয়ান আয় করো”—এই স্লোগান তখন ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে একই সুঁই বারবার ব্যবহারের ফলে হাজার হাজার মানুষ এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়। নয় বছর পর হেনান কর্তৃপক্ষ স্বীকার করে যে, প্রদেশের ২৫,০০০ প্রাক্তন প্লাজমা বিক্রেতা এইচআইভি পজিটিভ। এই ঘটনা চীনের রক্তজাত পণ্য শিল্পকে আমূল বদলে দেয় এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণের জন্ম দেয়।

ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও নিয়ন্ত্রণ

  • চীনের বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, একজন দাতা বছরে সর্বোচ্চ ২৪ বার প্লাজমা দিতে পারেন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে এই সংখ্যা ১০৪ বার পর্যন্ত হতে পারে।
  • অতীতের কলঙ্ক ও সামাজিক কুসংস্কারের কারণে প্লাজমা দানকে এখনো অনেক চীনা নাগরিক ‘বিপজ্জনক’ মনে করেন।
  • কোভিড-১৯ মহামারীর সময় প্লাজমাভিত্তিক থেরাপির চাহিদা বাড়লে চীনের এই আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকি জনসমক্ষে চলে আসে।
  • বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি কোনো কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যায়, তবে চীন বিকল্প উৎস খুঁজে পেতে হিমশিম খাবে।
  • চীন সরকার এখন অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করলেও, জননিরাপত্তা ও নৈতিক মানদণ্ড বজায় রাখা তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

পরিশেষে, গে লানের মতো সাধারণ রোগীদের জন্য এই ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং এটি তাদের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের সাথে সরাসরি যুক্ত। যতক্ষণ না চীন অভ্যন্তরীণভাবে প্লাজমা সংগ্রহের একটি নিরাপদ ও টেকসই ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের স্বাস্থ্যখাত যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতার ঝুঁকিতেই থাকবে।