অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া অঙ্গরাজ্যের আপিল আদালতে তিনজনকে হত্যার দায়ে দণ্ডিত এরিন প্যাটারসনের করা আপিলের শুনানি শুরু হয়েছে। ৫১ বছর বয়সী এরিন ২০২৩ সালের জুলাই মাসে তার লিওনগাথার বাড়িতে গরুর মাংসের পেস্ট্রি বা ‘বিফ ওয়েলিংটন’ খাইয়ে চার আত্মীয়কে বিষ প্রয়োগের দায়ে অভিযুক্ত হন। এই ঘটনায় তিনজনের মৃত্যু হয় এবং একজন গুরুতর অসুস্থ হয়েও প্রাণে বেঁচে যান। গত বছরের সেপ্টেম্বরে আদালত এরিনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করে। রায়ে বলা হয়, প্যারোলের জন্য আবেদন করার আগে তাকে কমপক্ষে ৩৩ বছর কারাগারে কাটাতে হবে। তবে রাষ্ট্রপক্ষ এই সাজার মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন জানিয়েছে। বৃহস্পতিবারের শুনানিতে প্রসিকিউটর ব্রেন্ডন কিসেন যুক্তি দেবেন যে, এরিনের সাজা হওয়া উচিত প্যারোলের সুযোগহীন যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
আপিল শুনানিতে এরিনের আইনজীবী রিচার্ড এডনি প্রথম যে বিষয়টি তুলে ধরেন তা হলো, বিচার চলাকালীন জুরি সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়ে ত্রুটি। তিনি দাবি করেন, জুরি সদস্যদের এমন একটি হোটেলে রাখা হয়েছিল যেখানে পুলিশের সাক্ষী এবং প্রসিকিউশন দলের সদস্যরাও অবস্থান করছিলেন। এডনি আদালতের কাছে এই পরিস্থিতিকে “This was a very serious breach of sequestration” বা জুরিদের বিচ্ছিন্নতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুতর লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেন। তবে প্রসিকিউটর কিসেন এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “There was no actual contact between any juror and any other person” অর্থাৎ কোনো জুরির সাথে অন্য কোনো ব্যক্তির সরাসরি যোগাযোগ হয়নি।
এরিনের আরেক আইনজীবী ভেরোনিকা ড্রাগো শুনানিতে দাবি করেন, এরিন প্যাটারসন যে লচ এবং আউটট্রিম শহরের কাছে বিষাক্ত ডেথ ক্যাপ মাশরুমের উপস্থিতি সম্পর্কে জানতেন, তার কোনো প্রমাণ নেই। যদিও ট্রায়ালের সময় একজন টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ সাক্ষ্য দিয়েছিলেন যে, এরিনের ফোনটি ওই এলাকাগুলোর টাওয়ারের সাথে সংযুক্ত ছিল। ড্রাগো এই সাক্ষ্যকে অস্পষ্ট এবং এরিনের জন্য অন্যায্য বলে বর্ণনা করেন। প্রসিকিউটর জেরেমি ম্যাকউইলিয়ামস পাল্টা যুক্তি দিয়ে বলেন, এই প্রমাণগুলো স্পষ্ট করে যে দুপুরের খাবারের আগে এরিনের কাছে বিষাক্ত মাশরুম সংগ্রহের সুযোগ ছিল।
আপিলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো প্রসিকিউটর ন্যানেট রজার্সের জেরার ধরন। প্রতিরক্ষা দল অভিযোগ করেছে যে, পাঁচ দিন ধরে চলা এই জেরা ছিল অত্যন্ত “unfair and oppressive” বা অন্যায্য ও দমনমূলক। এছাড়া, বিচারক ক্রিস্টোফার বেল এরিনের ফেসবুক বন্ধুদের সাক্ষ্য গ্রহণের অনুমতি দিয়ে বিচার প্রক্রিয়ায় পক্ষপাতিত্ব করেছেন বলেও দাবি করা হয়েছে। এরিন প্যাটারসন বুধবার আদালতে উপস্থিত ছিলেন না; তিনি কারাগার থেকে ভিডিও লিঙ্কের মাধ্যমে পুরো শুনানি পর্যবেক্ষণ করেন।
মামলার প্রেক্ষাপটে জানা যায়, এরিনের স্বামী সাইমন প্যাটারসনকে সেই দুপুরের খাবারে আমন্ত্রণ জানানো হলেও তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। সেই খাবারে এরিনের শ্বশুর ডন প্যাটারসন, শাশুড়ি গেইল প্যাটারসন এবং গেইলের বোন হেদার উইলকিনসন মারা যান। হেদারের স্বামী ইয়ান উইলকিনসন দীর্ঘ সময় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর প্রাণে বেঁচে ফেরেন। এরিন বরাবরই দাবি করে আসছেন যে, এই বিষক্রিয়াটি ছিল একটি দুর্ঘটনা।
শুনানিতে আইনজীবী ভার্গো দাবি করেন যে, বিচারের শুরুতে প্রসিকিউশন বলেছিল এরিনের কোনো মোটিভ বা উদ্দেশ্য ছিল না, কিন্তু শেষে তারা এরিনের সাথে তার শ্বশুরবাড়ির লোকজনের বিরোধকে মোটিভ হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। এটি ন্যায়বিচারের পরিপন্থী বলে তিনি মন্তব্য করেন। বিচারপতি লেসলি টেলর এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে ভার্গো জানান, তিনি প্রসিকিউটরদের পেশাগত অসদাচরণের অভিযোগ করছেন না, তবে প্রসিকিউশনের অবস্থানের এই পরিবর্তন বিভ্রান্তিকর।
এর আগে ট্রায়ালের সময় সাইমন প্যাটারসনের একটি গোপন সাক্ষ্য প্রকাশ্যে আসে, যেখানে তিনি অভিযোগ করেছিলেন যে এরিন অতীতেও তাকে খাবারে বিষ মিশিয়ে অসুস্থ করার চেষ্টা করেছিলেন। যদিও সেই ঘটনায় কোনো বিষের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এরিনকে প্রাথমিকভাবে ২০২১ সালের নভেম্বর থেকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে তার স্বামীকে তিনবার হত্যার চেষ্টার দায়ে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। তবে বিচারের আগেই প্রসিকিউশন সেই অভিযোগগুলো প্রত্যাহার করে নেয়।
যদি এই আপিল সফল হয়, তবে আদালত এরিনের সাজা বাতিল করে পুনরায় বিচারের নির্দেশ দিতে পারে। এরিন প্যাটারসন বর্তমানে তার যাবজ্জীবন সাজার অংশ হিসেবে কারাগারে রয়েছেন। মামলার পরবর্তী শুনানি বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে প্রসিকিউশন তার সাজার মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে চূড়ান্ত যুক্তি উপস্থাপন করবে।
পুরো বিষয়টি অস্ট্রেলিয়া জুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে ডেথ ক্যাপ মাশরুমের বিষক্রিয়া এবং এরিন প্যাটারসনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন রয়েছে। আদালত এখন উভয় পক্ষের যুক্তি পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

