চীনের অত্যন্ত প্রতীক্ষিত রোবটিক মিশন ‘চ্যাং ই-৭’ এ বছর আর উৎক্ষেপণ করা সম্ভব হচ্ছে না। চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে বরফ আকারে থাকা পানির অস্তিত্ব খুঁজে বের করার লক্ষ্য নিয়ে এই মিশনটি সাজানো হয়েছিল। চীনের ম্যানড স্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং অফিসের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই মিশনটি পরিচালনা করা সম্ভব নয়।
চীনের হাইনান প্রদেশ থেকে বেইজিং সময় অনুযায়ী রবিবার সন্ধ্যা বা সোমবার সকালের দিকে এই মহাকাশযানটি উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা ছিল। তবে মিশনটি কবে নাগাদ পুনরায় শুরু হতে পারে, সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা জানায়নি কর্তৃপক্ষ। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, লুনার প্রোবটি উৎক্ষেপণের জন্য প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। মিশনটির নির্ভরযোগ্যতা ও শতভাগ সাফল্যের কথা বিবেচনা করেই এই সতর্কতামূলক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
থাইল্যান্ডের ন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (NARIT) নির্বাহী পরিচালক বিপু রুজোপাকার্ন জানান, মিশনটি আগামী বছরের বসন্ত বা গ্রীষ্মের মাঝামাঝি সময়ে পুনরায় উৎক্ষেপণের সম্ভাবনা রয়েছে। এই মিশনের সাথে সাতটি আন্তর্জাতিক অংশীদার যুক্ত রয়েছে, যার মধ্যে NARIT অন্যতম। বিপু জানান, মিশনটি অত্যন্ত জটিল এবং এর আগে কেউ চাঁদের দক্ষিণ মেরুর কোনো ক্রেটারের কিনারে মহাকাশযান অবতরণের চেষ্টা করেনি।
মিশন বিলম্বের পেছনে মূলত দক্ষিণ চীনের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রতিকূল আবহাওয়া এবং উচ্চ উচ্চতার বাতাসকে দায়ী করা হচ্ছে। যদিও কারিগরি কিছু বিষয় থাকতে পারে, তবে উৎক্ষেপণের জন্য প্রতি বছর খুব অল্প সময় পাওয়া যায় বলে এই দীর্ঘ বিলম্ব অনিবার্য হয়ে পড়েছে। চ্যাং ই-৭ মিশনের মূল লক্ষ্য হলো চাঁদের পানির সরাসরি বিশ্লেষণ করা। এতে একটি রোবটিক ‘হপার’ থাকবে যা ল্যান্ডার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ক্রেটারের ভেতর ড্রিল করে বরফ সংগ্রহের চেষ্টা করবে।
চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে পানি পাওয়ার সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে এক ধরনের মহাকাশ প্রতিযোগিতা চলছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও এই অঞ্চলে মহাকাশযান পাঠানোর পরিকল্পনা করছে। পিটসবার্গের অ্যাস্ট্রোবোটিক টেকনোলজিস ২০২৬ সালের শেষের দিকে তাদের গ্রিফিন ল্যান্ডার পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। এছাড়া জেফ বেজোসের ব্লু অরিজিনও আগামী বছর দুটি রোবটিক ল্যান্ডার পাঠানোর পরিকল্পনা করেছে, যার একটিতে নাসার তৈরি ভাইপার রোভার থাকতে পারে।
ব্রাউন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জেমস হেড জানান, চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে পানির অস্তিত্ব সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে চ্যাং ই-৭ মিশনটি এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে। হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের লুনার ভূতত্ত্ববিদ ইউকি কিয়ানের মতে, চীনের এই মিশনটি মহাকাশ গবেষণায় একটি বড় পরিবর্তন। এটি কেবল অনুসন্ধানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে এখন সম্পদ ব্যবহারের দিকে মোড় নিচ্ছে।
চাঁদের দক্ষিণ মেরুর এই বরফ ভবিষ্যতে গভীর মহাকাশ গবেষণার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি থেকে অক্সিজেন, পানীয় জল এবং রকেট জ্বালানি তৈরি করা সম্ভব হতে পারে। এর আগে ২০২৫ সালে টেক্সাসের ইনটুইটিভ মেশিনস একটি ড্রিল পাঠানোর চেষ্টা করলেও অবতরণের সময় তা উল্টে যাওয়ায় মিশনটি ব্যর্থ হয়। ফলে চ্যাং ই-৭ এর এই বিলম্ব মহাকাশ প্রতিযোগিতার সমীকরণকে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

