কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির বিকাশে গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিট বা জিপিইউ চিপগুলো অপরিহার্য। এই চিপগুলো আকারে বেশ ছোট, এমনকি হাতের তালুতে অনায়াসেই রাখা যায়। তবে এগুলোই আধুনিক এআই মডেল তৈরির মূল ভিত্তি। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বিপুল সংখ্যক চিপ সংগ্রহের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। মাইক্রোসফটও এই তালিকার শীর্ষে রয়েছে। তবে কোম্পানিটির এআই সক্ষমতা নিয়ে সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানে বড় ধরনের গরমিল পাওয়া গেছে। গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোম্পানিটি এআই সক্ষমতা নিয়ে যে দাবি করেছে, তার সাথে তাদের ডেটাসেন্টারে থাকা উন্নত চিপের প্রকৃত সংখ্যার মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। এটি কোনো ছোটখাটো ঘাটতি নয়।
মাইক্রোসফট ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ বিশ্বজুড়ে তাদের ডেটাসেন্টারে ১৮ লাখ এআই চিপ স্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু প্রায় দুই বছর পর, ২৮০ বিলিয়ন ডলারের বিশাল বিনিয়োগ সত্ত্বেও, অভ্যন্তরীণ নথিপত্র অনুযায়ী কোম্পানিটির কাছে বর্তমানে ২২ লাখ এআই চিপ রয়েছে। এই বিশাল বিনিয়োগের মধ্যে গত প্রান্তিকে ৪১ বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করা হয়েছে। কোম্পানিটির প্রধান নির্বাহী সত্য নাদেলা গত বছর ঘোষণা করেছিলেন যে, ২০২৭ সালের মাঝামাঝি নাগাদ তারা তাদের বৈশ্বিক ডেটাসেন্টারের পরিধি দ্বিগুণ করবে। ২০২২ সাল থেকে কোম্পানিটি এআই অবকাঠামো নির্মাণের জন্য ভূমি, ভবন এবং কম্পিউটেশনাল প্রযুক্তিতে প্রায় ২৮০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে।
মাইক্রোসফটের বার্ষিক প্রতিবেদন এবং ত্রৈমাসিক আয়ের তথ্যে দাবি করা হয়েছে যে, গত দুই বছরে তারা এআই অবকাঠামোর অংশ হিসেবে ৫ গিগাওয়াট (GW) ডেটাসেন্টার সক্ষমতা যুক্ত করেছে। তবে এই হিসাবটি অসম্পূর্ণ বলে মনে হচ্ছে, কারণ ২০২২ সাল থেকেই কোম্পানিটি এআই অবকাঠামো নির্মাণ করছে। ২০২৪ সালের এক বিনিয়োগকারী উপস্থাপনায় মাইক্রোসফট দাবি করেছিল যে, তাদের ৫ গিগাওয়াট ডেটাসেন্টার সক্ষমতা আগে থেকেই ইনস্টল করা আছে। এই হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে তাদের মোট সক্ষমতা ১০ গিগাওয়াট হওয়ার কথা। ১০ গিগাওয়াট এআই ডেটাসেন্টার সক্ষমতার অর্থ হলো মাইক্রোসফটের কাছে প্রায় ৬৪ লাখ জিপিইউ থাকা উচিত।
ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, রিভারসাইডের অধ্যাপক শাওলেই রেন জানিয়েছেন, মাইক্রোসফটের স্থায়িত্ব প্রতিবেদনগুলো (sustainability reports) ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। তার মতে, একটি এআই ডেটাসেন্টারে মোট বিদ্যুতের ৮০ শতাংশই ব্যবহৃত হয় কম্পিউটার চিপের জন্য। ১০ গিগাওয়াটের ৮০ শতাংশ অর্থাৎ ৮ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ চিপের জন্য ব্যবহৃত হওয়ার কথা। একটি সার্ভার, যাতে আটটি এইচ১০০ জিপিইউ থাকে, তা প্রায় ১০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ খরচ করে। সেই হিসেবে ৮ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ দিয়ে ৮ লাখ সার্ভার বা ৬৪ লাখ চিপ চালানো সম্ভব। রেন উল্লেখ করেন যে, এই প্রতিবেদনগুলো আর্থিক প্রতিবেদনের চেয়ে বেশি নির্ভরযোগ্য কারণ এগুলো তৃতীয় পক্ষ দ্বারা নিরীক্ষিত।
তবে মাইক্রোসফট গার্ডিয়ানের এই হিসাবকে ভুল বলে দাবি করেছে। কোম্পানিটি জানায়, তাদের ডেটাসেন্টার সক্ষমতা বৃদ্ধির দাবির সাথে চিপের সংখ্যার কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই। কিন্তু তারা কোন তথ্যটি ভুল, তা স্পষ্ট করেনি। এনভিডিয়া তাদের চিপ বিক্রির সঠিক পরিসংখ্যান প্রকাশ করে না, ফলে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর কাছে ঠিক কতগুলো চিপ আছে তা নির্ধারণ করা কঠিন। একজন বিশ্লেষক মন্তব্য করেছেন যে, মাইক্রোসফটের পাবলিক স্টেটমেন্টের তুলনায় তাদের কাছে থাকা চিপের সংখ্যা বেশ কম। তার ভাষায়, “এই সংখ্যা আমার কাছে অনেক কম মনে হচ্ছে, যা মাইক্রোসফটের কাছ থেকে প্রত্যাশিত ছিল না।”
মাইক্রোসফটের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো জানিয়েছে, গত এক বছরে কোম্পানিটির এআই চিপের সংখ্যা খুব একটা বাড়েনি। এর একটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে ওপেনএআই-এর সাথে তাদের বাণিজ্যিক চুক্তির জটিলতা। এছাড়া, মাইক্রোসফটের অনেক বড় প্রকল্প এখনো পুরোপুরি চালু হয়নি। উদাহরণস্বরূপ, উইসকনসিন ও জর্জিয়ায় অবস্থিত তাদের বৃহত্তম এআই প্রকল্প ‘ফেয়ারওয়াটার’-এর কথা বলা যায়। এপ্রিলে নাদেলা দাবি করেছিলেন যে এই প্রকল্পটি চালু হচ্ছে, কিন্তু স্যাটেলাইট চিত্র থেকে দেখা যায় যে এর মাত্র একটি অংশ কার্যকর। মে মাসে মাইক্রোসফট স্বীকার করেছে যে, তাদের অনেক ডেটাসেন্টার এখনো নির্মাণাধীন।
অধ্যাপক রেন আরও বলেন, “কাগজে-কলমে এক প্রান্তিকে ১ গিগাওয়াট সক্ষমতা ঘোষণা করা সহজ, কিন্তু তা বাস্তবে কার্যকর করা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ।” মাইক্রোসফটের স্থায়িত্ব প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, তাদের নতুন ডেটাসেন্টারগুলোতে ৮৯ শতাংশ বিদ্যুৎ আইটি সিস্টেমে ব্যবহৃত হয় এবং ১১ শতাংশ অপচয় হয়। এই দক্ষতা বিবেচনা করলেও চিপের সংখ্যার ঘাটতি স্পষ্ট থেকে যায়। মাইক্রোসফটের দাবি এবং বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে এই ব্যবধান এআই শিল্পের দ্রুত প্রসারের ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
এই পরিস্থিতি এআই অবকাঠামো নির্মাণের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। মাইক্রোসফট দাবি করে যে তারা দ্রুতগতিতে এআই অবকাঠামো তৈরি করছে, কিন্তু তাদের নিজস্ব নথিপত্র এবং স্থায়িত্ব প্রতিবেদনের মধ্যে তথ্যের অমিল রয়েছে। বিনিয়োগকারীরা এখন এই গরমিলের কারণ জানতে আগ্রহী। কোম্পানিটি যদি তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির দাবি পূরণ করতে না পারে, তবে তা তাদের দীর্ঘমেয়াদী এআই পরিকল্পনায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে যখন বিশ্বের অন্যান্য প্রযুক্তি জায়ান্টরাও একই ধরনের চিপ সংগ্রহের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে।
গার্ডিয়ানের তদন্তে আরও উঠে এসেছে যে, মাইক্রোসফটের কাছে এনভিডিয়ার নতুন মডেলের চিপের সংখ্যাও প্রত্যাশার চেয়ে কম। অভ্যন্তরীণ নথিপত্র অনুযায়ী, কোম্পানিটি তাদের এআই সক্ষমতা নিয়ে যে উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল, তা অর্জনে তারা বেশ পিছিয়ে আছে। এই ঘাটতি কেবল চিপের সংখ্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি ডেটাসেন্টার পরিচালনার সামগ্রিক সক্ষমতার সাথেও সম্পর্কিত। এআই মডেলগুলোর প্রশিক্ষণের জন্য যে বিশাল কম্পিউটিং শক্তির প্রয়োজন, তা সরবরাহ করতে মাইক্রোসফট কতটা সক্ষম, তা নিয়ে এখন বড় ধরনের সংশয় তৈরি হয়েছে।
পরিশেষে, মাইক্রোসফটের এআই সক্ষমতা নিয়ে এই বিতর্কটি প্রযুক্তি বিশ্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এআই চিপের সরবরাহ সংকট এবং ডেটাসেন্টার নির্মাণের ধীরগতি কি মাইক্রোসফটের এআই আধিপত্যকে বাধাগ্রস্ত করবে? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে কোম্পানিটির পরবর্তী আর্থিক প্রতিবেদন এবং এআই অবকাঠামোর প্রকৃত অবস্থার দিকে নজর রাখতে হবে। আপাতত, গার্ডিয়ানের এই অনুসন্ধান মাইক্রোসফটের এআই অগ্রযাত্রার পথে একটি বড় চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা কোম্পানিটিকে তাদের কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করতে পারে।

