সলিমুল্লাহ হলের ১৭১ নম্বর কক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতির কার্যালয় ও অর্থনীতির নীতিনির্ধারণ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ১৭১ নম্বর কক্ষটি একসময় চারজন তরুণের আবাসস্থল ছিল। সেই চার তরুণের মধ্যে দুজন ছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। ১৯৬৫ সালে তাঁরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন এবং হল জীবনের অনেকটা সময় একই কক্ষে কাটিয়েছেন। তাঁদের সেই সময়ের বন্ধুত্বের স্মৃতি আজও অম্লান, যা সময়ের পরিক্রমায় দুই ভিন্ন ধারার সফলতায় রূপ নিয়েছে।

তৎকালীন উত্তাল রাজনৈতিক পরিবেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল নানা আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু। ষাটের দশকের সেই অস্থির সময়ে তরুণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেশ ও সমাজ নিয়ে গভীর সচেতনতা তৈরি হয়েছিল। তবে সেই হল জীবন সবসময় শান্ত ছিল না। অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ তাঁর স্মৃতিচারণে উল্লেখ করেছেন, তৎকালীন আইয়ুবপন্থী ছাত্রসংগঠন এনএসএফের কর্মীরা তাঁদের কক্ষে অন্তত দুবার হামলা চালিয়ে আসবাবপত্র তছনছ করেছিল। এমন প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও তাঁদের শিক্ষাজীবন ও বন্ধুত্ব অটুট ছিল।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষে তাঁদের কর্মজীবন ভিন্ন ভিন্ন পথে ধাবিত হয়। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করলেও পরবর্তীতে সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন এবং দীর্ঘ সময় বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার পর ২০২৬ সালের ২০ আগস্ট সংসদ সদস্যদের ভোটে তিনি বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হন।

অন্যদিকে, ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ অর্থনীতি, গবেষণা ও শিক্ষকতাকে নিজের কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে অধ্যাপনার পাশাপাশি তিনি দেশের একজন প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ হিসেবে পরিচিতি পান। ২০২৪ সালে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারে তিনি পরিকল্পনা ও শিক্ষা উপদেষ্টার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।

পেশাগত জীবনের ভিন্নতা ও রাজনৈতিক অবস্থানের পার্থক্য তাঁদের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বে কোনো ছেদ টানতে পারেনি। ২০২০ সালে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের জন্মদিনে তাঁর বাসায় মির্জা ফখরুল, আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও আহমেদ কামাল একত্রিত হয়ে আড্ডা দিয়েছিলেন। এছাড়া ২০২৫ সালে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ নিজেই জানিয়েছিলেন যে, মির্জা ফখরুল তাঁর শিক্ষাজীবনের বন্ধু ও সাবেক রুমমেট। এমনকি শিক্ষা ও প্রশাসনে যোগ্য ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার ক্ষেত্রেও তিনি বন্ধুর সঙ্গে পরামর্শ করেছিলেন বলে উল্লেখ করেন।

সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের সেই ১৭১ নম্বর কক্ষ থেকে শুরু হওয়া যাত্রা আজ দুই বন্ধুর জন্য ভিন্ন গন্তব্য তৈরি করেছে। একজন এখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে আসীন, অন্যজন দেশের অর্থনীতির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। তাঁদের এই দীর্ঘ জীবনের গল্পটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই পুরনো হলের স্মৃতিকে আজও নতুন করে সামনে নিয়ে আসে।