মার্কিন শুল্কের জবাবে কানাডার পাল্টা ব্যবস্থা: ‘ডলারের বিনিময়ে ডলার’ নীতি ঘোষণা

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ঘোষণা দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক আরোপিত শুল্কের বিপরীতে কানাডা ‘ডলারের বিনিময়ে ডলার’ নীতিতে পাল্টা শুল্ক আরোপ করবে। শুক্রবার মধ্যরাতের সময়সীমার মধ্যে দুই দেশের মধ্যে কোনো বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত না হওয়ায় এই উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ওয়াশিংটন এবং অটোয়ার মধ্যে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে এই বাণিজ্য বিরোধ বড় ধরনের ফাটল ধরিয়েছে, যা ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর পররাষ্ট্রনীতির প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

চুক্তি ভেস্তে যাওয়ার নেপথ্য কারণ

শুক্রবার ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম এবং গাড়ির ওপর শুল্ক কমানোর বিষয়ে দুই দেশ চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছালেও শেষ মুহূর্তে তা ভেস্তে যায়। কানাডীয় কর্মকর্তারা আন্তরিকভাবে আলোচনার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু মার্ক কার্নি এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, “শেষ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত শর্তাবলীতে আনা পরিবর্তনগুলো ছিল অন্যায্য, অযৌক্তিক এবং তা যেকোনো চুক্তির বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।” অন্যদিকে, মার্কিন কর্মকর্তারা দাবি করেছেন যে, কানাডা শেষ মুহূর্তে অতিরিক্ত সুবিধা দাবি করায় চুক্তিটি ভেঙে পড়েছে।

পাল্টা ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক প্রভাব

মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার এই পরিস্থিতিকে কানাডার জন্য একটি ‘হারানো সুযোগ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র কানাডাকে তাদের বাজারে যেকোনো বড় রপ্তানিকারকের চেয়ে সেরা সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল, কিন্তু কানাডার নতুন দাবি ও আগের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসা চুক্তির ভারসাম্য নষ্ট করেছে। এই বিরোধের ফলে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের কানাডীয় পণ্য মার্কিন শুল্কের আওতায় পড়বে।

রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক প্রতিক্রিয়া

  • মার্ক কার্নি স্পষ্ট করেছেন যে, কানাডা তার শ্রমিক ও ব্যবসার সুরক্ষায় এই শুল্কের সমানুপাতিক জবাব দেবে।
  • অন্টারিও’র প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ড এক্স-এ লিখেছেন, “টিম কানাডাকে এখন আগের চেয়ে বেশি ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর এই কঠোর অবস্থানের প্রতি আমার পূর্ণ সমর্থন রয়েছে।”
  • কানাডিয়ান চেম্বার অফ কমার্সের প্রধান ক্যান্ডেস ল্যাং এই শুল্ককে উত্তর আমেরিকার প্রতিযোগিতার সক্ষমতার ওপর একটি ‘বড় আঘাত’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
  • তিনি সতর্ক করে বলেছেন, এই পদক্ষেপ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে খরচ বাড়াবে এবং কানাডার বিনিয়োগ ও ছোট ব্যবসাগুলোকে হুমকির মুখে ফেলবে।

এই বাণিজ্য বিরোধ উত্তর আমেরিকা অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যকার বিদ্যমান বাণিজ্য চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়েও বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই শুল্ক ইতিমধ্যে দুর্বল থাকা বিভিন্ন খাতকে অর্থনৈতিক চাপের মুখে ফেলবে, যার ফলে কর্মসংস্থান হ্রাস এবং দোকানপাট বন্ধ হওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে। ট্রাম্পের এই নতুন আমদানি শুল্ক কানাডা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আসা প্রায় ৫ শতাংশ পণ্যের ওপর কার্যকর হবে, যার মধ্যে হকি স্টিক থেকে শুরু করে চিকিৎসা সরঞ্জাম পর্যন্ত রয়েছে।

ভবিষ্যৎ ও কূটনৈতিক সংকট

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকটের প্রভাব অর্থনৈতিক ক্ষতির চেয়েও বেশি সুদূরপ্রসারী হতে পারে। গত বছর দুই দেশ ৮৮০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য ও সেবা লেনদেন করেছে। কার্নি জানিয়েছেন, তার সরকার আগামী কয়েক দিনের মধ্যে কানাডীয় শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের সহায়তায় নতুন পদক্ষেপ ঘোষণা করবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, কানাডার লক্ষ্য ছিল সেরা চুক্তিটি নিশ্চিত করা, তবে তা কোনো মূল্যে বা নির্দিষ্ট সময়সীমার চাপে নয়। কানাডার সাধারণ মানুষও মার্কিন নীতির প্রতি ক্ষুব্ধ, বিশেষ করে কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য বানানোর ট্রাম্পের মন্তব্যের পর থেকে উত্তেজনা তুঙ্গে। মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিট হোয়েক্সট্রাকে বহিষ্কারের দাবিতে একটি পিটিশনে প্রায় ২ লাখ ৪৮ হাজার স্বাক্ষর জমা পড়েছে। কার্নি জানিয়েছেন, আমেরিকা বদলে গেছে এবং দুই দেশ আর আগের সম্পর্কে ফিরে যাবে না। বর্তমানে কোনো নতুন আলোচনার পরিকল্পনা নেই এবং কানাডা তার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সব ধরনের প্রস্তুতি রাখছে।