ইরান যুদ্ধের ছয় মাস: বিভক্ত যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত ইরানি প্রবাসীরা

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরান অভিযানের ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে। এই যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট শারীরিক, আর্থিক ও মানসিক প্রভাব তেহরান থেকে শুরু করে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বিশাল ইরানি সম্প্রদায়ের মধ্যেও এই যুদ্ধ নিয়ে তীব্র মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। যুদ্ধের সূচনা এবং এর অর্জন বা ব্যর্থতা নিয়ে তাদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে।

ইরানি প্রবাসীদের এই গোষ্ঠীটি বিভিন্ন প্রজন্মের সমন্বয়ে গঠিত। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর যারা দেশ ছেড়েছিলেন, তাদের পাশাপাশি সাম্প্রতিক দমন-পীড়ন ও প্রতিবাদ আন্দোলনের মুখে যারা দেশত্যাগ করেছেন, তারাও এর অন্তর্ভুক্ত। এই ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা যুদ্ধের প্রতি তাদের প্রতিক্রিয়ায় প্রভাব ফেলেছে। সরকারবিরোধী অনেক সক্রিয় কর্মী মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলাকে ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের শাসনের অবসানের পথ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছিলেন।

অন্যদিকে, অনেকে সামরিক সংঘাতের মানবিক বিপর্যয় নিয়ে শঙ্কিত ছিলেন। তাদের মতে, বেসামরিক মানুষের কষ্ট এবং আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা কোনো রাজনৈতিক লাভের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতিকর। এই বিভক্তি কেবল রাজনৈতিক মতাদর্শ নয়, বরং নির্বাসন, দমন-পীড়ন এবং ইরানের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন।

লস অ্যাঞ্জেলেসের রাজতন্ত্রপন্থী কর্মী আরিজো রাশিদিয়ান যুদ্ধের শুরুতে সামরিক পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। তিনি আশা করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের সামরিক ঘাঁটিগুলোতে লক্ষ্যভেদী হামলা চালিয়ে বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে ক্ষমতাচ্যুত করবে। তবে ছয় মাস পর, তার সেই আশাবাদ এখন হতাশায় রূপ নিয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা শাসন পরিবর্তনের আশা করেছিলাম, কিন্তু ছয় মাস পার হয়ে গেলেও তা সম্ভব হয়নি।”

রাশিদিয়ান জানান, ইরানের ভেতরে তার পরিচিতরা যুদ্ধের তীব্রতার পর থেকে নতুন করে ভয়ের পরিবেশ দেখছেন। জানুয়ারি মাসের প্রতিবাদে অংশগ্রহণকারীরা এখন নজরদারি ও প্রতিশোধের ভয়ে রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে ইতস্তত বোধ করছেন। তিনি দাবি করেন, যুদ্ধের তীব্রতা কিছুটা কমলেও দেশটির গোপন পুলিশ বাহিনী পুনরায় সক্রিয় হয়ে উঠছে। যদিও এসব তথ্য নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তবে সাম্প্রতিক সময়ে দেশটিতে হিজাব আইন প্রয়োগের কড়াকড়ি ও বিভিন্ন গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া যাচ্ছে।

হতাশা সত্ত্বেও রাশিদিয়ান তেহরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখার পক্ষে। এদিকে, মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, ইরান যাতে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলতে না পারে, সেজন্য ওয়াশিংটন নতুন পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকি দিয়েছে। তবে ট্রাম্পের ঘোষিত তথাকথিত অর্থনৈতিক ‘ডি-ডে’ পদক্ষেপগুলো প্রত্যাশা অনুযায়ী বড় কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি, বরং বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞার প্রয়োগ বাড়ানোর দিকেই বেশি নজর দেওয়া হয়েছে। জবাবে ইরানও পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, তারা আঞ্চলিক তেল উৎপাদনকারী দেশ ও ইউরোপীয় দেশগুলোতে হামলা বাড়াতে পারে এবং পারমাণবিক কর্মসূচিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের ইঙ্গিত দিয়েছে।

নিউইয়র্কের জাদুঘর কর্মী আরিয়া রোস্তামি এই যুদ্ধের প্রতি প্রবাসীদের উচ্ছ্বসিত সমর্থন দেখে হতাশ হয়েছেন। তিনি বলেন, “রাস্তায় যখন মানুষ যুদ্ধের সমর্থনে উল্লাস করছিল, তখন আমি অত্যন্ত মর্মাহত হয়েছিলাম।” তার মতে, এই সংঘাত প্রবাসীদের মধ্যকার বিভাজনকে সামনে নিয়ে এসেছে। আগে রাস্তায় ফারসি ভাষাভাষী কাউকে দেখলে তিনি যে আত্মীয়তা অনুভব করতেন, এখন সেখানে অনিশ্চয়তা ও সন্দেহের জায়গা তৈরি হয়েছে।

রোস্তামি মনে করেন, ইরাক, আফগানিস্তান ও লিবিয়ার অভিজ্ঞতার পর ইরানের ক্ষেত্রে সামরিক হস্তক্ষেপের ধারণাটি ভুল ছিল। তার মতে, যারা এই যুদ্ধের পক্ষে ছিলেন, তাদের মিথ্যা প্রত্যাশা দেখিয়ে বিভ্রান্ত করা হয়েছে। তিনি বলেন, “মানুষকে মিথ্যা বলা হয়েছে এবং তাদের বোকা বানানো হয়েছে। তবে আমি মনে করি, এই যুদ্ধের সমর্থক অনেকের মধ্যেই প্রকৃত বেদনা রয়েছে এবং তাদেরও এক ধরনের কারসাজির শিকার হতে হয়েছে।”