দেশের ৬৪টি জেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, দুর্নীতি ও মাদক নিয়ন্ত্রণ, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ৩০ জন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও জাতীয় সংসদের হুইপকে বিভিন্ন জেলার দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে রাজনৈতিক নেতৃত্বের নজরদারি আরও জোরদার করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
শিল্প ও অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুই জেলা গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের দায়িত্ব পেয়েছেন হাবিবুর রশিদ হাবিব। রাজধানী ঢাকার পার্শ্ববর্তী এই দুই জেলা দেশের পোশাক শিল্প, ওষুধ, সিরামিক ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতের প্রধান কেন্দ্র। এই অঞ্চলগুলোতে শিল্পকারখানার নিরাপত্তা, শ্রমিকদের বিভিন্ন অভিযোগ, স্থানীয় মানুষের নাগরিক দুর্ভোগ, অপরাধের ধরন, মাদক বিস্তার এবং নদী ও পরিবেশগত সমস্যাগুলো নিয়মিত তদারকি করা হবে।
সরকারের নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে জেলা প্রশাসনের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণের একটি কার্যকর সুযোগ তৈরি হলো। দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও হুইপদের কাজ শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ নয়, বরং সংশ্লিষ্ট জেলার সামগ্রিক প্রশাসনিক কার্যক্রম, উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ওপর নজর রাখা। এছাড়া সরকারি সেবার মান নিশ্চিত করাও তাদের অন্যতম দায়িত্বের অংশ।
প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বিগত সরকারের সময়ে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে নাগরিক সেবা ব্যাহত হয়েছে। নতুন এই ব্যবস্থার মাধ্যমে জেলা পর্যায়ের সরকারি দপ্তরগুলোকে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখার বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ এবং দিকনির্দেশনা দেওয়া হবে। তবে প্রজ্ঞাপনে তাদের কোনো প্রশাসনিক ক্ষমতা সরাসরি বাড়ানোর কথা বলা হয়নি, বরং সমন্বয় ও তদারকির ওপরই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্রগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ইকবাল হাসান মাহমুদ রাজশাহী ও নাটোরের দায়িত্ব পেয়েছেন। মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি চট্টগ্রামের দায়িত্ব পালন করবেন। এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত শেরপুর, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনার দায়িত্ব পেয়েছেন। আসাদুল হাবিব দুলু ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় দেখবেন। সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল মানিকগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জের দায়িত্ব পেয়েছেন। সাচিং প্রু কক্সবাজার এবং মো. শরীফুল আলম টাঙ্গাইল ও নরসিংদীর দায়িত্ব পালন করবেন।
অন্যান্য জেলার মধ্যে শামা ওবায়েদ ইসলাম মাদারীপুর ও শরীয়তপুর, অনিন্দ্য ইসলাম অমিত মেহেরপুর, কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহ এবং আব্দুল বারী বগুড়া ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের দায়িত্ব পেয়েছেন। পার্বত্য তিন জেলা খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙামাটির দায়িত্ব মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। মো. রাজীব আহসান বরগুনা, পটুয়াখালী ও পিরোজপুরের দায়িত্ব পেয়েছেন। ফারজানা শারমিন সিরাজগঞ্জ ও পাবনা, শেখ ফরিদুল ইসলাম যশোর, মাগুরা ও নড়াইল এবং ইমরান খান চৌধুরী জামালপুর ও কিশোরগঞ্জের দায়িত্ব পালন করবেন।
এছাড়া মোহাম্মদ শামীম কায়সার জয়পুরহাট ও নওগাঁ, মো. জি কে গউছ সিলেট ও সুনামগঞ্জ এবং মিয়া নূরুদ্দিন অপু রাজবাড়ী, ফরিদপুর ও গোপালগঞ্জের দায়িত্ব পেয়েছেন। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, মাদকের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচার বন্ধ এবং চোরাচালান প্রতিরোধের ওপর বিশেষ নজর দেবেন বলে প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে।
এদিকে, সরকারের উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির অংশ হিসেবে ৩ লাখ ৬৫ হাজার টন সার কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যার জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকা। এই বিশাল কর্মযজ্ঞের সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাও নতুন দায়িত্বপ্রাপ্তদের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আগামী সেপ্টেম্বরে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার সম্ভাবনা রয়েছে এবং নভেম্বরের শেষে ভোট হতে পারে। এই নির্বাচনী পরিবেশ বজায় রাখা এবং জেলা পর্যায়ে সুশাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই রাজনৈতিক তদারকি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পরিশেষে, এই ব্যবস্থার সাফল্য নির্ভর করবে দায়িত্বপ্রাপ্তরা কতটা কার্যকরভাবে মাঠ প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করতে পারেন তার ওপর। বিশেষ করে গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও শিল্পসমৃদ্ধ অঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষ বা চাঁদাবাজির মতো সমস্যাগুলো মোকাবিলায় হাবিবুর রশিদ হাবিবের তদারকি বিশেষ তাৎপর্য বহন করবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দেশের ৬৪ জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, দুর্নীতি ও মাদক নিয়ন্ত্রণ, সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির বাস্তবায়ন নজরদারির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ৩০ জন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও জাতীয় সংসদের হুইপকে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: লুট করা অর্থের একটি অংশ বিদেশে পাচার হয়েছে এবং আরেকটি অংশ দেশের ভেতরে মাদকসহ বিভিন্ন সামাজিক অবক্ষয়, জননিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ফলে এসব এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সামান্য অবনতিও শিল্প উৎপাদন, শ্রমিকদের জীবনযাপন এবং পণ্য পরিবহনে প্রভাব ফেলতে পারে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: প্রয়োজনে জেলার বিভিন্ন সভায় অংশ নিয়ে পরামর্শও দিতে পারবেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দুই জেলায় শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা, শ্রমিকদের বিভিন্ন সমস্যা, শিল্পকারখানায় অস্থিরতা, মাদক ও চোরাচালান, পরিবহনব্যবস্থা এবং দ্রুত নগরায়ণের ফলে তৈরি হওয়া নানা সংকট নিয়মিত নজরদারির প্রয়োজন হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আবদুল আউয়াল মিন্টুকে দেওয়া হয়েছে লক্ষ্মীপুর এবং নিতাই রায় চৌধুরী পেয়েছেন চুয়াডাঙ্গার দায়িত্ব।

