গত ৭ আগস্ট দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক দিনের মধ্যেই কলম্বিয়ার নতুন প্রেসিডেন্ট আবেলিয়ার্দো দে লা এস্প্রিয়েলা ইসরায়েলের সাথে দেশটির সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছেন। এর মাধ্যমে তিনি তার পূর্বসূরি গুস্তাভো পেত্রোর গাজা ইস্যুতে নেওয়া কঠোর অবস্থান থেকে সরে এলেন। গত জুনে অনুষ্ঠিত রান-অফ নির্বাচনে বামপন্থী প্রার্থী ইভান সেপেদাকে এক শতাংশেরও কম ব্যবধানে পরাজিত করে ক্ষমতায় আসা দে লা এস্প্রিয়েলা তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী জেরুজালেমে কলম্বিয়ার দূতাবাস পুনরায় খোলার ঘোষণা দিয়েছেন। একই সাথে, ২০২৩ সালের অক্টোবরে পেত্রোর নেওয়া ফিলিস্তিনে দূতাবাস খোলার পরিকল্পনাটি স্থগিত করেছেন তিনি, কারণ সেই কার্যালয়টি কখনোই কার্যকর হয়নি।
কূটনৈতিক সম্পর্কের নতুন মোড় ও গোলান মালভূমি
কূটনৈতিক সম্পর্কের এই নতুন মোড়ে কলম্বিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে সিরিয়ার অধিকৃত গোলান মালভূমির ওপর ইসরায়েলের সার্বভৌমত্বকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পর দ্বিতীয় দেশ হিসেবে কলম্বিয়া এই বিতর্কিত অঞ্চল নিয়ে ইসরায়েলের দাবির প্রতি সমর্থন জানাল। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে এস্প্রিয়েলাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। এছাড়া, উভয় দেশ ১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হওয়া পারস্পরিক ভিসা অব্যাহতি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে এবং কলম্বিয়া-ইসরায়েল দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক কমিশন গঠন করেছে। পাশাপাশি, পেত্রোর আমলে বন্ধ হয়ে যাওয়া ইসরায়েলে কয়লা রপ্তানি পুনরায় শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বোগোতা।
আন্তর্জাতিক আদালতে অবস্থান পরিবর্তন
দে লা এস্প্রিয়েলার সরকার গাজায় ইসরায়েলের কথিত গণহত্যার বিষয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার দায়ের করা মামলায় কলম্বিয়ার পূর্ববর্তী হস্তক্ষেপ বা সমর্থন প্রত্যাহার করে নিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই নাটকীয় পরিবর্তনের পেছনে ইসরায়েলের চেয়ে ওয়াশিংটনের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষ্যই বেশি কাজ করছে। কলম্বিয়ার জাতিসংঘের সাবেক প্রতিনিধি আরলেন বেথ টিকনারের মতে, এই পদক্ষেপ কলম্বিয়ার নিজস্ব স্বার্থের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনের একটি কৌশল।
বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ ও ভূ-রাজনীতি
- ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশেষজ্ঞ গ্যালেডিস গঞ্জালেজ মনে করেন, এটি কোনো আকস্মিক পরিবর্তন নয়, বরং কলম্বিয়া দুই দশক ধরে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল যা পেত্রোর আমলে সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল।
- জেরুজালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড্যানিয়েল ওয়াজনারের মতে, ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন কলম্বিয়ার জন্য ওয়াশিংটনের সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়ার একটি ‘সেতু’ হিসেবে কাজ করছে।
- চ্যাথাম হাউসের সহযোগী ফেলো মারিয়ানো আগুইরে আর্নস্টের মতে, এই দ্রুত সিদ্ধান্ত ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে সংহতি এবং কলম্বিয়ার রক্ষণশীল রাজনৈতিক ও সামরিক মহলে একটি বার্তা দেওয়ার চেষ্টা।
- ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ক্ষেত্রেও এই স্বীকৃতি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি গাজায় যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা ও বয়কটের মুখে সরকারকে কিছুটা বৈধতা দেয়।
- টিকনার সতর্ক করে বলেছেন, গোলান মালভূমির স্বীকৃতি এবং জেরুজালেমে দূতাবাস খোলার পরিকল্পনা আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের সনদের পরিপন্থী, যা শেষ পর্যন্ত কলম্বিয়ার দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থের ক্ষতি করতে পারে।
পরিশেষে, প্রেসিডেন্ট দে লা এস্প্রিয়েলার এই নীতিগত পরিবর্তন কলম্বিয়ার পররাষ্ট্রনীতিতে এক নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদিও সরকার এটিকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নয়ন হিসেবে দেখছে, তবে সমালোচকরা একে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং জনমতের তোয়াক্কা না করে নেওয়া একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত হিসেবে অভিহিত করছেন। কলম্বিয়ার সাধারণ জনগণের মধ্যে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে, যা নতুন সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

