বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান বৈষম্য মোকাবিলায় জাতিসংঘের নতুন একটি উদ্যোগে যুক্তরাজ্যের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ৪০ জন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ। এই তালিকায় রয়েছেন নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিৎজ, ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক মারিয়ানা মাজুকাতো, লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের ভাইস-চ্যান্সেলর ল্যারি ক্রেমার এবং ‘দ্য স্পিরিট লেভেল’-এর সহ-লেখক কেট পিকেট।
শিক্ষাবিদরা তাদের খোলা চিঠিতে উল্লেখ করেছেন যে, প্রধানমন্ত্রীর নীতিমালার মূল ভিত্তি ‘মেকারফিল্ড টেস্ট’ যেমন ওয়েস্টমিনিস্টারের অবহেলিত অঞ্চলগুলোতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে, তেমনি বৈষম্য একটি বৈশ্বিক সমস্যা হিসেবেও প্রকট হয়ে উঠছে। ভূ-রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে এই সমস্যা আরও গভীর হচ্ছে বলে তারা সতর্ক করেছেন।
প্রস্তাবিত ইন্টারন্যাশনাল প্যানেল অন ইনইকুয়ালিটি (IPI) সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এটি বৈষম্যের কারণ ও ফলাফল নিয়ে একটি স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য বৈশ্বিক তথ্যভাণ্ডার গড়ে তুলবে। একইসঙ্গে, বৈষম্য হ্রাসে কার্যকর নীতিমালার বিশ্লেষণও প্রদান করবে এই প্যানেল। তারা মনে করেন, এই উদ্যোগে সমর্থন দিলে বার্নহাম তার রাজনৈতিক আদর্শকে বিশ্বমঞ্চে আরও সুদৃঢ় করতে পারবেন।
আগামী বছর যুক্তরাজ্য জি২০-এর সভাপতিত্ব গ্রহণ করতে যাচ্ছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বৈশ্বিক উন্নয়নে লেবার পার্টির নেতৃত্ব পুনরুদ্ধারের জন্য দাতব্য সংস্থা, থিংকট্যাঙ্ক এবং ব্যাকবেঞ্চ এমপিরা প্রধানমন্ত্রীর প্রতি চাপ প্রয়োগ করছেন। জি২০ হলো এমন একটি অর্থনৈতিক ফোরাম, যেখানে চীন, ভারত ও ব্রাজিলের মতো গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর পাশাপাশি জি৭-এর প্রভাবশালী দেশগুলোও অন্তর্ভুক্ত থাকে।
জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক আন্তঃসরকার প্যানেলের আদলে গঠিত এই নতুন সংস্থাটির নেতৃত্বে থাকবেন স্টিগলিৎজ। এটি চরম সম্পদ বৈষম্য পর্যবেক্ষণ এবং বৈশ্বিক নীতিগত সমাধান সুপারিশ করবে। ইতিমধ্যে ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, নরওয়ে এবং স্পেন এই প্যানেল গঠনে সম্পৃক্ত হয়েছে। শিক্ষাবিদরা বার্নহামকে আগামী মাসে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে এই উদ্যোগের প্রতি যুক্তরাজ্যের দৃঢ় সমর্থন ব্যক্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন।
ম্যানচেস্টারের মেয়র হিসেবে নয় বছর দায়িত্ব পালনকালে বৈষম্য নিরসনে বার্নহামের যে রেকর্ড রয়েছে, তা এই উদ্যোগের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এদিকে, কিয়ার স্টারমারের শাসনামলে প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়াতে গিয়ে আন্তর্জাতিক সহায়তা বা এইড বাজেট ব্যাপকভাবে কমানো হয়েছিল, যার ফলে তৎকালীন উন্নয়ন মন্ত্রী অ্যানালিস ডডস পদত্যাগ করেন।
পররাষ্ট্র সচিব ডেভিড ল্যামি আন্তর্জাতিক উন্নয়নকে লেবার পার্টির অগ্রাধিকার তালিকায় রাখার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে কিছু এমপি জাতীয় আয়ের ০.৭ শতাংশ বৈদেশিক সহায়তার লক্ষ্যমাত্রায় ফিরে যাওয়ার দাবি জানিয়েছেন। গর্ডন ব্রাউনের আমলে এই লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত থাকলেও কোভিড মহামারীর সময় ঋষি সুনাকের সরকার তা কমিয়ে ফেলেছিল। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই কাটছাঁটের ফলে আফ্রিকার কিছু দেশে দ্বিপাক্ষিক সহায়তা ৯০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে।
স্টিগলিৎজ অতীতে ভ্যাটিকানের একটি কমিশনের প্রধান হিসেবে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঋণ সংকট নিরসনে কাজ করেছেন। তিনি ঋণগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য ত্রাণ এবং ‘ভালচার ফান্ড’-এর দৌরাত্ম্য কমাতে নতুন আইন প্রণয়নের সুপারিশ করেছিলেন।
শিক্ষাবিদদের চিঠির জবাবে পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রবৃদ্ধি বিষয়ক মন্ত্রী স্টুয়ার্ট উড জানিয়েছেন, অর্থনীতিকে আরও ন্যায্য ও উৎপাদনশীল করার বিষয়টি কেবল অভ্যন্তরীণ নয়, বরং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের ওপরও নির্ভরশীল। তিনি আরও বলেন, সরকার মিত্রদের সাথে নিয়ে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানো, বৈষম্য মোকাবিলা এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর করার লক্ষ্যে কাজ করে যাবে।

