হরমুজ প্রণালীতে সংঘাত: কীভাবে ঝুঁকি মোকাবিলা করছে লয়েডস অফ লন্ডন

লন্ডনের কেন্দ্রে অবস্থিত লয়েডস অফ লন্ডনের সদর দপ্তরে আড়াইশ বছরেরও বেশি সময় ধরে সমুদ্রপথে হারিয়ে যাওয়া জাহাজের তথ্য হাতে লেখা হচ্ছে। এখানকার ঐতিহ্যবাহী ‘লস বুকস’ বা ক্ষতির খাতায় ১৯১২ সালের এপ্রিলে টাইটানিকের ডুবে যাওয়ার ঘটনাও লিপিবদ্ধ রয়েছে। আজও ‘ওয়েটার’ নামে পরিচিত কর্মীরা রাজহাঁসের পালকের কলম ও কালি ব্যবহার করে এই রেকর্ডগুলো সংরক্ষণ করেন। ১৬৮৮ সালে এডওয়ার্ড লয়েডের কফি শপে এই বিমা বাজারের যাত্রা শুরু হয়েছিল, যেখানে কর্মীরা কফি পরিবেশনের পাশাপাশি সামুদ্রিক খবরাখবর সরবরাহ করতেন। সেই ঐতিহ্যের অংশ হিসেবেই আজও তাদের ওয়েটার বলা হয়।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার প্রতিক্রিয়ায় তেহরান হরমুজ প্রণালী অবরোধ করলে লয়েডস মার্কেট দ্রুত সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই ঘটনার পর প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়, যার ফলে বিমা প্রিমিয়ামের হারও নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। যুদ্ধের ঝুঁকি মোকাবিলায় আগের বিমা পলিসিগুলো বাতিল করে অনেক বেশি মূল্যে নতুন করে পলিসি ইস্যু করা হয়। ম্যাকগিল অ্যান্ড পার্টনার্সের সামুদ্রিক বিমা বিভাগের প্রধান ডেভিড স্মিথ জানান, মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে আন্ডাররাইটাররা এখন প্রতিটি জাহাজের ঝুঁকি নতুন করে যাচাই করছেন।

মার্শ বিমা ব্রোকারেজ ফার্মের সামুদ্রিক ও কার্গো বিভাগের প্রধান মার্কাস বেকারের তথ্যমতে, সংঘাতের আগে প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের বিমা হার ছিল ভেসেলের মূল্যের ০.২৫% থেকে ০.৫%। হামলার পর তা ১০% পর্যন্ত পৌঁছেছিল। উদাহরণস্বরূপ, ১০০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারের ক্ষেত্রে এই বিমা খরচ দাঁড়ায় ১০ মিলিয়ন ডলারে। বর্তমানে জাহাজের কাঠামোগত ক্ষতির ঝুঁকি বা ‘হাল ওয়ার রেট’ জাহাজের মূল্যের ১% থেকে ৩%-এর মধ্যে ওঠানামা করছে। কিছু ক্ষেত্রে জাহাজ মালিকদের জন্য ‘নো-ক্লেম বোনাস’-এর ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে, যেখানে কোনো দুর্ঘটনা ছাড়া জাহাজ চলাচল সম্পন্ন হলে প্রিমিয়ামের অর্ধেক অর্থ ফেরত দেওয়া হয়।

হরমুজ সংকট বিমা কোম্পানিগুলোর জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিষয়। ডেভিড স্মিথ জানান, ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে প্রতি ঘণ্টায় বিমা প্রিমিয়ামের হার পরিবর্তিত হতে পারে। আগে যেখানে ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা আগে পলিসি নির্ধারণ করা হতো, এখন তা কমিয়ে মাত্র ছয় ঘণ্টায় নামিয়ে আনা হয়েছে। ইস্যু করার পর এই পলিসিগুলো সাধারণত তিন থেকে সাত দিনের জন্য কার্যকর থাকে। স্মিথ একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেন, যেখানে এক জাহাজ মালিক প্রণালীতে প্রবেশের মাত্র ছয় মিনিট আগে বিমা পলিসি নিশ্চিত করার জন্য যোগাযোগ করেছিলেন। তখন মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে বিমা সনদ জাহাজের কমান্ড ডেকে পৌঁছে দেওয়া হয়, কারণ নাবিকরা নিশ্চিত হতে চেয়েছিলেন যে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তাদের পরিবার ক্ষতিপূরণ পাবে।

আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের তথ্য অনুযায়ী, সংঘাত শুরুর পর থেকে অন্তত ১৪ জন নাবিক নিহত হয়েছেন। লয়েডস মার্কেট অ্যাসোসিয়েশনের নীল রবার্টসের মতে, চলতি বছর লস বুকে কোনো জাহাজ ধ্বংস হওয়ার রেকর্ড না থাকলেও, অন্তত ৫০টি জাহাজের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। যদিও বিমা সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে, তবুও নিরাপত্তার খাতিরে অনেক জাহাজ মালিকই এখন এই পথ এড়িয়ে চলছেন। আলিয়াঞ্জ বিমা কোম্পানির গত মাসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ১,১৫০টি কার্গো জাহাজ, যার পণ্য ও জাহাজের মূল্য প্রায় ১২৫ বিলিয়ন ডলার, পারস্য উপসাগরে আটকা পড়ে আছে।

যদি সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে আটকা পড়া অনেক জাহাজকে ‘টোটাল লস’ বা সম্পূর্ণ ক্ষতি হিসেবে গণ্য করা হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এছাড়া জাহাজ মালিকরা আটকা পড়া জাহাজের পরিচালনা ও কর্মী খরচের জন্য বিমা দাবি করতে পারেন। বিমা ব্রোকার এওন-এর বেন স্টোন মনে করেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কোনো স্থায়ী সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত প্রিমিয়ামের হার স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার সম্ভাবনা কম।

নতুন এক জটিলতা হিসেবে সামনে এসেছে হরমুজ টোল বা মাশুল প্রদানের বিষয়টি। পশ্চিমা বিমা কোম্পানিগুলো স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, তারা এমন কোনো জাহাজকে বিমা সুরক্ষা দেবে না যা ইরানের কোনো অনুমোদিত সংস্থাকে ফি প্রদান করে। এমনকি ওমানের মতো তৃতীয় কোনো পক্ষ যদি টোল সংগ্রহ করে, তবুও তা আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন লঙ্ঘনের শামিল হতে পারে, যার ফলে বিমা কোম্পানিগুলো পলিসি বাতিল করার অধিকার রাখে।

লয়েডস অফ লন্ডনের বর্তমান ভবনটি ১৯৮৬ সালে ব্রিটিশ স্থপতি রিচার্ড রজার্স ডিজাইন করেছিলেন। ইস্পাত ও কাঁচের তৈরি এই ভবনটি তার অনন্য কাঠামোর জন্য ‘ইনসাইড-আউট বিল্ডিং’ নামে পরিচিত। তৎকালীন প্রিন্স চার্লস একে ‘লাইম স্ট্রিটের তেল খনি’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। ঐতিহাসিক ও স্থাপত্যশৈলীর গুরুত্বের কারণে এটি যুক্তরাজ্যের একটি তালিকাভুক্ত ভবন হিসেবে সংরক্ষিত।