মার্কিন নৌবাহিনীর একটি নতুন বিমানবাহী রণতরীর নাম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বীর ডরিস মিলারের পরিবর্তে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নামে রাখার গুঞ্জন নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। ২১ আগস্ট, শুক্রবার কৃষ্ণাঙ্গ সম্প্রদায়ের নেতারা এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন। ২০২০ সালে নৌবাহিনী ঘোষণা করেছিল যে, জেরাল্ড আর. ফোর্ড-শ্রেণির চতুর্থ রণতরীটির নামকরণ করা হবে টেক্সাসের ওকোতে জন্মগ্রহণকারী ডরিস মিলারের নামে। তবে সিএনএন এবং এনবিসি নিউজের তথ্য অনুযায়ী, নৌবাহিনী এখন এই জাহাজটির নাম ‘ইউএসএস ডরিস মিলার’-এর পরিবর্তে ‘ইউএসএস ডোনাল্ড ট্রাম্প’ রাখার বিষয়টি বিবেচনা করছে।
এনএএসিপি-এর প্রেসিডেন্ট ডেরিক জনসন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে এই পদক্ষেপকে প্রতিটি যুদ্ধবীর এবং ইউনিফর্ম পরা প্রতিটি সেনাসদস্যের জন্য ‘গালে চড় মারার শামিল’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা যখন ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন জাহাজে অত্যন্ত শোচনীয় পরিস্থিতিতে জীবনযাপন করছেন, তখন একজন প্রেসিডেন্টের নিজের নাম নৌবাহিনীর জাহাজে রাখার আকাঙ্ক্ষা থাকাটা বোধগম্য নয়।
ডরিস মিলার ছিলেন নৌবাহিনীর একজন কৃষ্ণাঙ্গ তালিকাভুক্ত নাবিক। ১৯৪১ সালে পার্ল হারবারে জাপানি হামলার সময় তিনি অসীম সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন। কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই তিনি আহত নাবিকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি বিমান বিধ্বংসী কামান চালিয়ে অন্তত একটি জাপানি বিমান ভূপাতিত করেছিলেন। ১৯৪৩ সালে জাপানি টর্পেডো হামলায় তিনি নিহত হন। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তার সমর্থকরা মনে করেন, বর্ণবাদের কারণেই তাকে সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান ‘মেডেল অফ অনার’ দেওয়া হয়নি, বরং তাকে দেওয়া হয়েছিল ‘নেভি ক্রস’।
বিশিষ্ট নাগরিক অধিকার আইনজীবী বেন ক্রাম্প মিলারের বীরত্ব তুলে ধরে বলেন, পার্ল হারবারে যখন দেশ তাকে পুরোপুরি স্বীকৃতি দেয়নি, তখনও তিনি জীবন বাঁচিয়েছেন এবং দেশের সুরক্ষায় লড়াই করেছেন। তিনি আরও বলেন, এখন নৌবাহিনী তার সম্মানে নির্মিত রণতরী থেকে তার নাম মুছে ফেলে সেখানে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম বসাতে চাইছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
মিশিগানের ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি ডেবি ডিঙ্গেল, যিনি তার শ্বশুর জন ডিঙ্গেল সিনিয়র-এর অসমাপ্ত কাজ এগিয়ে নিচ্ছেন, তিনিও এই নাম পরিবর্তনের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, ডরিস মিলার সাহস এবং ত্যাগের প্রতীক। তাকে সম্মান জানানোর অর্থ হলো আমেরিকার ইতিহাসে কৃষ্ণাঙ্গদের অপরিহার্য ভূমিকাকে স্বীকৃতি দেওয়া।
সিএনএন-এর তথ্যমতে, নৌবাহিনী ডরিস মিলারের নামে অন্য একটি যুদ্ধজাহাজ রাখার পরিকল্পনা করছে এবং তাকে মরণোত্তর মেডেল অফ অনারের জন্য সুপারিশ করেছে। তবে এনবিসি জানিয়েছে, হোয়াইট হাউস এখনো এই সুপারিশ অনুমোদন করেনি। হোয়াইট হাউস এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বিষয়টি পেন্টাগনের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। নৌবাহিনী ও পেন্টাগন কর্মকর্তারাও এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।
সিভিএন-৮১ নামে পরিচিত এই রণতরীটি ২০৩৪ সালের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। তবে ২০২৬ সালের শেষদিকে জাহাজের কিল-লেয়িং অনুষ্ঠানের আগেই এর নাম চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ডরিস মিলারের নামে নামকরণ করা হলে এটি হতো কোনো কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তির নামে নামকরণ করা প্রথম মার্কিন রণতরী। এর আগে ইউএসএস মিলার (এফএফ-১০৯১) নামে একটি ফ্রিগেট তার নামে রয়েছে।
২০২০ সালে প্রথম ট্রাম্প প্রশাসনের সময় মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র দিবসে নৌবাহিনী মিলারের নামে রণতরীর নামকরণের ঘোষণা দিয়েছিল। তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত নৌ সচিব থমাস বি. মডলি বলেছিলেন, ডরিস মিলার ছিলেন একজন ভাগচাষির সন্তান এবং ক্রীতদাসের বংশধর। তিনি আরও বলেছিলেন, মিলারকে ভিন্ন বর্ণের মানুষের মতো সমান সুযোগ দেওয়া হয়নি, কিন্তু ১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর তিনি অন্যের কুসংস্কার দিয়ে নিজেকে সংজ্ঞায়িত হতে দেননি।
মিলার তার বীরত্বের জন্য নেভি ক্রসের পাশাপাশি পার্পল হার্ট, আমেরিকান ডিফেন্স সার্ভিস মেডেল, এশিয়াটিক-প্যাসিফিক ক্যাম্পেইন মেডেল এবং ওয়ার্ল্ড ওয়ার টু ভিক্টোরি মেডেল অর্জন করেছিলেন। ১৯৪০-এর দশকে তৎকালীন নৌ সচিব ফ্রাঙ্ক নক্স মিলারকে মেডেল অফ অনার দেওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, যা আজও এক বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে রয়ে গেছে।
