যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি ব্যর্থ: কানাডিয়ান পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন কর্তৃক কানাডিয়ান পণ্যের ওপর আরোপিত ৫০ শতাংশ শুল্ক শনিবার ভোর থেকে কার্যকর হয়েছে। মার্কিন ও কানাডিয়ান কর্মকর্তাদের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনার পরও কোনো চূড়ান্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত না হওয়ায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ট্রাম্প প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মতে, উভয় পক্ষই আলোচনার ব্যর্থতার জন্য একে অপরকে দায়ী করেছে।

শুল্ক আরোপের প্রেক্ষাপট ও প্রভাব

শনিবার রাত ১২টা ১ মিনিটে এই নতুন শুল্ক কার্যকর হয়। এর আওতায় হকি স্টিক থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের মদসহ কয়েক ডজন পণ্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, কানাডা পূর্বনির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী চুক্তি চূড়ান্ত করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। গ্রিয়ার আরও অভিযোগ করেন যে, কানাডা মার্কিন পণ্যের ওপর দীর্ঘস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা বজায় রেখেছে এবং নতুন নতুন দাবি উত্থাপন করে আলোচনার ভারসাম্য নষ্ট করেছে।

কানাডার প্রতিক্রিয়া ও পাল্টা পদক্ষেপ

শুক্রবার গভীর রাতে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এক ঘোষণায় যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য আলোচনা স্থগিত করার কথা জানান। তিনি মার্কিন প্রস্তাবিত শর্তগুলোকে ‘অন্যায্য’ এবং ‘অর্থনৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য’ বলে অভিহিত করেন। কার্নি জানান, এই ৫০ শতাংশ শুল্ক প্রায় ২৮ বিলিয়ন ডলার মূল্যের কানাডিয়ান পণ্যের ওপর প্রভাব ফেলবে এবং কানাডা এর জবাবে সমপরিমাণ শুল্ক আরোপ করবে।

আলোচনার জটিলতা ও ট্রাম্পের অবস্থান

  • ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে, কানাডার সাথে একটি প্রাথমিক সমঝোতা হয়েছে, যার ফলে মার্কিন কৃষিপণ্যের ওপর কানাডার শুল্ক শূন্যে নেমে আসবে।
  • ট্রাম্পের মতে, এই চুক্তির মাধ্যমে মার্কিন কৃষকদের ওপর কানাডার আরোপিত বিশাল শুল্কের বোঝা দূর হওয়ার কথা ছিল।
  • কানাডিয়ান ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর শুল্ক কমানোর বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প জানান, বিষয়টি বিবেচনাধীন রয়েছে।
  • মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয় জানিয়েছে, চূড়ান্ত চুক্তিতে আমেরিকান পণ্যের জন্য ব্যাপক বাজার সুবিধা এবং ডিজিটাল বাণিজ্যের সমন্বয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
  • ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, এই চুক্তির অংশ হিসেবে কি স্টোন এক্সএল পাইপলাইন প্রকল্পটি পুনরায় চালুর চেষ্টা করা হতে পারে, যা ২০২১ সালে পরিবেশগত উদ্বেগের কারণে বাতিল করা হয়েছিল।

এই শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে ১৯৩০ সালের ট্যারিফ অ্যাক্টের ৩৩৮ ধারা ব্যবহার করা হয়েছে, যা প্রেসিডেন্টকে এমন দেশগুলোর বিরুদ্ধে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেয় যারা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বৈষম্যমূলক আচরণ করে। ইউবিএস-এর অর্থনীতিবিদ এবিগেইল ওয়াট এক মেমোতে উল্লেখ করেছেন যে, এই ধারাটি আগে কখনও প্রয়োগ করা হয়নি, ফলে এর কোনো আইনি নজির নেই।

উল্লেখ্য যে, এই শুল্কের আওতায় ইউএসএমসিএ (USMCA) চুক্তির অধীনে থাকা পণ্যগুলোও পড়েছে, তবে তেল, গ্যাস এবং পটাশের মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যগুলোকে এর আওতামুক্ত রাখা হয়েছে। ট্রাম্পের এই পদক্ষেপটি এমন সময়ে এল যখন তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ ৬০টি বাণিজ্য অংশীদারের ওপর নতুন শুল্ক আরোপ করেছেন। সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক বাতিল হওয়া শুল্ক ব্যবস্থা পুনর্গঠনের অংশ হিসেবেই এই কঠোর বাণিজ্য নীতি গ্রহণ করা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

কানাডার সাথে ট্রাম্পের এই বাণিজ্য বিরোধ দীর্ঘদিনের। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি বিভিন্ন সময়ে কানাডার সাথে বাণিজ্য আলোচনার চেষ্টা করেছেন। তবে সাম্প্রতিক এই ব্যর্থতা দুই দেশের মধ্যকার অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এবং মার্কিন প্রশাসনের এই মতপার্থক্য এখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।