ফ্লোরিডা, আলাস্কা ও ওয়াইমিংয়ের প্রাইমারি নির্বাচন: ট্রাম্পের প্রভাব ও রাজনৈতিক সমীকরণের নতুন মোড়

ফ্লোরিডার গভর্নর রন ডিস্যান্টিসের মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রেক্ষাপটে ভোটাররা যখন নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন মঙ্গলবার রিপাবলিকানরা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক ঘনিষ্ঠ মিত্রকে মনোনয়ন দিয়েছে। অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটরা এমন একজনকে প্রার্থী হিসেবে বেছে নিয়েছে, যিনি প্রেসিডেন্টের নীতির বিরোধিতার কারণে রিপাবলিকান দল ত্যাগ করেছিলেন। ফ্লোরিডার গভর্নর পদে রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ডস প্রাইমারি নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন। তিনি তার প্রচারণায় প্রপার্টি ট্যাক্স সংস্কার এবং ডেটা সেন্টার নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়গুলোতে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তবে তার জয় প্রত্যাশিত হলেও ৫০ শতাংশের মাইলফলক স্পর্শ করতে না পারা নিয়ে দলের ভেতরেই প্রশ্ন উঠেছে। একজন রিপাবলিকান তহবিল সংগ্রহকারী সিএনএনকে জানান, তার এই ফলাফল দলের জন্য কিছুটা বিস্ময়কর। ডোনাল্ডস ১০ কোটি ডলারেরও বেশি তহবিল সংগ্রহ করেছিলেন এবং রাজ্যের ১৫ লাখ অতিরিক্ত নিবন্ধিত রিপাবলিকান ভোটারের সমর্থন তার বড় শক্তি ছিল।

এদিকে, ডেমোক্র্যাটিক সোশালিস্টরা তাদের ক্রমবর্ধমান প্রভাব আবারও প্রমাণ করেছে। ফ্লোরিডার সিনেট প্রাইমারিতে স্টেট রিপ্রেজেন্টেটিভ অ্যাঞ্জি নিক্সনের জয় ডেমোক্র্যাটিক রাজনীতিতে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নিক্সন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা ভিন্ডম্যানকে পরাজিত করেছেন, যিনি প্রচারণার খরচে নিক্সনের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিলেন। এই জয় ডেমোক্র্যাটিক ভোটারদের মধ্যে ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধ নিয়ে ক্রমবর্ধমান হতাশার প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। নিক্সন তার প্রচারণায় প্রারম্ভিক শৈশব শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছিলেন। যদিও তিনি শীর্ষস্থানীয় প্রগতিশীল নেতাদের সমর্থন পাননি, তবুও তার এই জয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অবাক করেছে। তার এই জয় এমন এক সময়ে এল, যখন ফ্লোরিডার ১৯তম ডিস্ট্রিক্টে কৃষ্ণাঙ্গ আইনপ্রণেতার প্রতিনিধিত্ব হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা গত ৩০ বছরের মধ্যে প্রথম।

নির্বাচনী জয়ের পর ডোনাল্ডস তার সমর্থকদের উদ্দেশ্যে বলেন, “আজ রাতে আমেরিকান রাজনীতিতে একটি নতুন জোটের উদ্ভব ঘটছে এবং এটি ফ্লোরিডা থেকেই শুরু হয়েছে।” তিনি রিক স্কটকে ধন্যবাদ জানান একটি শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে তোলার জন্য। তিনি আরও যোগ করেন, “আমরা আজ রাতে আমাদের মতপার্থক্যগুলো দূরে সরিয়ে রেখেছি। আমরা একটি ঐক্যবদ্ধ রিপাবলিকান পার্টি।” তবে ডোনাল্ডসের এই জয় খুব একটা অনুপ্রেরণামূলক ছিল না। ট্রাম্পের সমর্থন এবং রাজ্য রিপাবলিকান প্রতিষ্ঠানের সমর্থন থাকা সত্ত্বেও তিনি ৫০ শতাংশের নিচে ছিলেন। কেন তিনি এই সীমা অতিক্রম করতে পারলেন না, তা নিয়ে তার প্রচারণাকে নতুন করে ভাবতে হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

অন্যদিকে, অ্যারিজোনার গভর্নর পদে ট্রাম্পের আরেক ঘনিষ্ঠ মিত্র অ্যান্ডি বিগস ৭৪ শতাংশ ভোট পেয়ে রিপাবলিকান মনোনয়ন নিশ্চিত করেছেন। তবে ফ্লোরিডার গভর্নর পদে ট্রাম্পের প্রভাব মিশ্র ছিল। আইওয়া, মিনেসোটা, জর্জিয়া এবং সাউথ ক্যারোলিনায় ট্রাম্পের সমর্থিত প্রার্থীরা জয় পেলেও, ওয়াইমিংয়ের রিপাবলিকান প্রাইমারিতে ট্রাম্পের পছন্দের প্রার্থী পরাজিত হয়েছেন। সেখানে ভোটাররা স্টেট সিনেটর এরিক বার্লোকে বেছে নিয়েছেন। তবে সিনেট নির্বাচনে ট্রাম্পের একনিষ্ঠ মিত্র সিনথিয়া লুমিসের অবসরের পর সেখানে রিপাবলিকানদের অবস্থান বেশ শক্তিশালী।

ফ্লোরিডার রাজনীতিতে বিতর্কিত রিপাবলিকানদের জন্য মঙ্গলবার ছিল বেশ কঠিন। নৈতিক তদন্তের মুখে থাকা রিপাবলিকান প্রতিনিধি কোরি মিলস এবং অন্যান্য বিতর্কিত প্রার্থীরা তাদের লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছেন। কোরি মিলসকে নিয়ে হাউস এথিক্স কমিটি সম্ভাব্য নির্বাচনী তহবিল অনিয়ম নিয়ে তদন্ত করছে। এই তদন্ত তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করা হচ্ছে। একই সাথে, ফ্লোরিডার ১৯তম ডিস্ট্রিক্টের রিপাবলিকান হাউস প্রাইমারিতে সাবেক দুই কংগ্রেস সদস্যও তাদের লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছেন।

ডেভিড জলি, যিনি ২০১৮ সালে রিপাবলিকান দল ত্যাগ করে গত বছর আনুষ্ঠানিকভাবে ডেমোক্র্যাট হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন, তিনি এই নির্বাচনের ফলাফলের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তার মতে, ফ্লোরিডা এখন আর আগের মতো সুইং স্টেট নেই। ডোনাল্ডস সাধারণ নির্বাচনে বড় ধরনের তহবিল সুবিধা নিয়ে প্রবেশ করছেন। তবে ডেমোক্র্যাটিক সোশালিস্টদের উত্থান এবং নিক্সনের মতো প্রার্থীর জয় প্রমাণ করে যে, তৃণমূল পর্যায়ে রাজনীতির সমীকরণ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে।

অ্যাঞ্জি নিক্সন তার জয়ের পর সমর্থকদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, “এটি গুরুত্বপূর্ণ এবং আমি লড়াই চালিয়ে যাব যাতে এই প্রতিনিধিত্ব আবারও অর্থবহ হয়ে ওঠে।” তিনি তার আইনসভার রেকর্ড এবং জনকল্যাণমূলক কাজের ওপর ভিত্তি করেই এই জয় পেয়েছেন। যদিও তিনি ডেমোক্র্যাটিক সোশালিস্টদের সাথে যুক্ত হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন, তবে তিনি লেবেলের চেয়ে মানুষের চাহিদাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।

সবশেষে, ফ্লোরিডার রাজনৈতিক দৃশ্যপট এখন সাধারণ নির্বাচনের দিকে মোড় নিচ্ছে। রিপাবলিকানরা ট্রাম্পের প্রভাব এবং তহবিল সংগ্রহের সুবিধা নিয়ে এগিয়ে থাকলেও, ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে নতুন প্রজন্মের নেতাদের উত্থান এবং প্রগতিশীল এজেন্ডাগুলো ভোটারদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা তৈরি করেছে। আগামী মাসগুলোতে এই রাজনৈতিক লড়াই আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যেখানে ভোটাররা তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবেন।