প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কিম জং উনের সাথে চলতি বছর পুনরায় আলোচনার আগ্রহ প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই উত্তর কোরিয়া বেশ কয়েকটি স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। সিউলের সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার পিয়ংইয়ং এলাকা থেকে প্রায় ১০টি স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়। জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেও বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে এবং তাদের দাবি, ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইতিমধ্যে সমুদ্রে পতিত হয়েছে। এই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল যখন যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ সামরিক মহড়া ‘উলচি ফ্রিডম শিল্ড’ শেষ হওয়ার পথে।
সামরিক মহড়া হ্রাস ও ট্রাম্পের অবস্থান
ট্রাম্প কিম জং উনের সাথে তার ‘খুব ভালো সম্পর্কের’ কথা উল্লেখ করে এই মহড়া সংক্ষিপ্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন। তার মতে, এই বার্ষিক মহড়া উত্তর কোরিয়ার জন্য একটি ‘সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত এবং বৈরী সংকেত’ হিসেবে কাজ করছিল। এছাড়া ইরানের সাথে চলমান যুদ্ধে দক্ষিণ কোরিয়ার সহায়তা না থাকাকেও এই সিদ্ধান্তের একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি। ট্রাম্প কিমের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন এবং দাবি করেন যে পিয়ংইয়ংয়ের কাছে বর্তমানে ৫৭টি অত্যন্ত শক্তিশালী পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। তবে সিউলের কর্মকর্তাদের মতে, উত্তর কোরিয়ার কাছে ৮০ থেকে ১২০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড থাকতে পারে, যা ট্রাম্পের তথ্যের সাথে সাংঘর্ষিক।
পারমাণবিক অস্ত্র ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা
- উত্তর কোরিয়া দীর্ঘকাল ধরে মার্কিন-দক্ষিণ কোরিয়ার মহড়াকে আক্রমণের মহড়া হিসেবে বর্ণনা করে আসছে এবং প্রায়ই এর আশেপাশে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালায়।
- পেন্টাগন জানিয়েছে, মহড়া সংক্ষিপ্ত করা হলেও মার্কিন প্রশিক্ষণের লক্ষ্যমাত্রায় কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।
- দক্ষিণ কোরিয়ায় বর্তমানে প্রায় ২৮,৫০০ মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে, যা ১৯৫০-৫৩ সালের কোরীয় যুদ্ধের উত্তরাধিকার হিসেবে টিকে আছে।
- দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন গিউ-ব্যাক জানিয়েছেন, সিউল উত্তর কোরিয়াকে পারমাণবিক রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিরোধী।
- ওয়াশিংটন কি উত্তর কোরিয়ার পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের লক্ষ্য থেকে সরে এসেছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে আন জানিয়েছেন, তিনি তা মনে করেন না।
- প্রেসিডেন্ট লি জায়ে মিউং জানিয়েছেন, তিনি ট্রাম্পের শান্তি প্রচেষ্টাকে সমর্থন করতে তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন।
কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ
কিম জং উনের বোন কিম ইয়ো জং জানিয়েছেন, তার ভাইয়ের ট্রাম্পের সাথে ‘ভালো স্মৃতি ও অনুভূতি’ রয়েছে এবং দুই নেতার সম্পর্ক এখনও চমৎকার। তবে তাদের মধ্যে বর্তমানে কোনো যোগাযোগ আছে কি না, তা তিনি জানেন না। ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে কিমের সাথে তিনবার বৈঠক করেছিলেন, কিন্তু পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি আদায় করতে ব্যর্থ হন। এদিকে, ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের এই হঠাৎ মনোযোগ এবং যৌথ মহড়া কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত এশীয় মিত্রদের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প হয়তো ইরান যুদ্ধের অচলাবস্থার মাঝে একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য খুঁজছেন।
উলচি ফ্রিডম শিল্ড মহড়াটি শুক্রবার শেষ হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু মার্কিন পক্ষের পরামর্শে তা এক সপ্তাহ আগেই গুটিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই মহড়াগুলো মূলত উত্তর কোরিয়ার সম্ভাব্য আক্রমণের প্রস্তুতির জন্য ডিজাইন করা হয়েছিল। সিউলের প্রেসিডেন্ট লি জায়ে মিউং দীর্ঘকাল ধরে দক্ষিণ কোরিয়ার নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়ে আসছেন, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা কমানো যায়। এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ কোরীয় উপদ্বীপের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে, যেখানে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের চেয়ে দুই নেতার ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপরই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

