গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন যৌথভাবে ইরানে আক্রমণ শুরু করে, তখন ওয়াশিংটন প্রাথমিকভাবে দাবি করেছিল যে এই যুদ্ধ চার থেকে ছয় সপ্তাহের মধ্যে শেষ হবে। তবে বাস্তব পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। মার্কিন প্রশাসন বারবার যুদ্ধের লক্ষ্যমাত্রা ও সময়সীমা পরিবর্তন করেছে। ওয়াশিংটন কখনো দাবি করেছে তারা নির্ধারিত সময়ের চেয়ে “ahead of schedule” বা এগিয়ে আছে, আবার কখনো বলেছে যুদ্ধ আরও দুই থেকে তিন সপ্তাহ চলবে কিংবা “as long as necessary” বা প্রয়োজন অনুযায়ী দীর্ঘায়িত হবে।
বর্তমানে যুদ্ধের পাঁচ মাস ২১ দিন পার হয়ে গেছে। যদিও সংঘাতের তীব্রতা এখন কিছুটা কম, তবুও বারবার যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টা সত্ত্বেও লড়াই অব্যাহত রয়েছে। এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের শুরুতে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ইরানের দীর্ঘদিনের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি, সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা এবং শত শত বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। এর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ইরান হরমুজ প্রণালীতে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়, যা বিশ্বজুড়ে অস্থিরতা সৃষ্টি করে।
অপারেশন এপিক ফিউরির অধীনে চলমান এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং ৬০০ থেকে ৯০০ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া মার্কিন বাহিনী বিপুল পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম হারিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ডজনখানেক ড্রোন, বেশ কয়েকটি যুদ্ধবিমান ও ট্যাঙ্কার। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ এই যুদ্ধের ব্যয় ৩৭.৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইরানের পক্ষ থেকে চালানো ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার অনেকগুলো প্রতিহত করা গেলেও, স্যাটেলাইট চিত্র এবং সরকারি প্রতিবেদন অনুযায়ী, অনেক অবকাঠামো ও সামরিক সরঞ্জাম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রাডার সিস্টেম, আকাশ প্রতিরক্ষা স্থাপনা, হ্যাঙ্গার, জ্বালানি ডিপো, উড়োজাহাজ এবং বিভিন্ন মিত্র দেশের যোগাযোগ নেটওয়ার্ক।
ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের হামলায় মার্কিন ঘাঁটি ও সম্পদের যে ক্ষতি হয়েছে, তা পেন্টাগনকে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সামরিক অবস্থানের পুনর্মূল্যায়নের একটি বিরল সুযোগ করে দিয়েছে। কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ক্ষতিগ্রস্ত অনেক ঘাঁটি হয়তো আগের মতো করে পুনর্নির্মাণ করা হবে না। আটজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেছে, পেন্টাগন এখন মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সামরিক উপস্থিতির আকার ও ধরন পরিবর্তনের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ এখন মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে যে, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করা হবে কি না। কারণ, আমেরিকার বড় বড় সামরিক ঘাঁটিগুলো গত কয়েক মাসের ইরানি হামলায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পেন্টাগনের পলিসি অফিস, জয়েন্ট স্টাফ এবং ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড যৌথভাবে এই পর্যালোচনা পরিচালনা করছে।
পেন্টাগনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ওয়াশিংটন পোস্টকে জানিয়েছেন যে, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক পর্যালোচনার নির্দেশ দেননি। তবে তিনি এটিকে “prudent planning” বা বিচক্ষণ পরিকল্পনা হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা ক্ষতিগ্রস্ত ঘাঁটিগুলো পুনর্নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করবে। তিনি আরও বলেন, “কিছু বিষয়ে এখন সিদ্ধান্ত নিতেই হবে।”
বর্তমানে ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড জর্ডান থেকে ওমান পর্যন্ত প্রায় ২০টি স্থানে প্রায় ৪০,০০০ সেনা মোতায়েন রেখেছে। চলতি বছরের শুরু থেকে ওয়াশিংটন অতিরিক্ত যুদ্ধজাহাজ, যুদ্ধবিমান এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করেছে এবং ইরানের ওপর ১৩,০০০-এর বেশি হামলা চালিয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে বাহরাইনে পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর এবং কুয়েতের মতো দেশগুলোতে বড় ধরনের সেনা ও বিমান বাহিনীর ঘাঁটি রয়েছে।
যদিও পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় জুন মাসে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছিল, যার উদ্দেশ্য ছিল শত্রুতা বন্ধ করা এবং চূড়ান্ত চুক্তির জন্য ৬০ দিনের একটি আলোচনার সুযোগ তৈরি করা, তবুও এখনো আকাশপথে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের আনাগোনা থামেনি। পেন্টাগনের এই বিশ্লেষণ নিয়ে প্রশাসনের ভেতরেই বিতর্ক চলছে। এক পক্ষ সামরিক হস্তক্ষেপের পক্ষে, অন্য পক্ষ মনে করে পেন্টাগনের উচিত তাদের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি কিছুটা কমিয়ে আনা।
ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাডলি কুপারও মার্কিন সেনাদের উপসাগর থেকে পশ্চিম দিকে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনার সমর্থন জানিয়েছেন। সাবেক মার্কিন কূটনীতিক মাইকেল র্যাটনি, যিনি সৌদি আরবে মার্কিন দূত এবং কাতারে ডেপুটি চিফ অব মিশন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, তিনি মনে করেন, জর্ডান, ইসরায়েল বা সৌদি আরবের লোহিত সাগরের উপকূলে সেনা ও সরঞ্জাম সরিয়ে নিলে চাপ কিছুটা কমতে পারে। তবে তিনি স্বীকার করেছেন যে, এটি এই সমস্যার কোনো “perfect solution” বা নিখুঁত সমাধান নয়।

