ইরান থেকে পালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নেওয়া নারীকে আফ্রিকার দেশ সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকে নির্বাসন

ইরানের শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে প্রাণ বাঁচাতে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানো নিকা (ছদ্মনাম) এখন এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে। তিনি ভেবেছিলেন, বিশ্বের অন্যতম সেরা একটি দেশে তিনি নতুন জীবন শুরু করতে পারবেন। কিন্তু তার সেই আশা দ্রুতই ফিকে হয়ে যায়। ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন অভিবাসন নীতির আওতায় নিকার মতো অনেক অভিবাসীকে এমন সব দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যেখানে তারা আগে কখনো যাননি এবং যা কোনোভাবেই নিরাপদ নয়।

নিজের জীবনের গল্প বলতে গিয়ে নিকা জানান, যৌবনের বড় একটি সময় তিনি ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে কাটিয়েছেন। তিনি কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে বলেন, তার অনেক বন্ধুকে সরকার হত্যা করেছে এবং অনেকে এখনো কারাগারে বন্দি। তিনি বিশ্বাস করেন, ইরানে ফিরে গেলে তাকেও নিশ্চিত মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হবে।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে, যার ফলে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন। নিকা যুক্তরাষ্ট্রে বসে এই ঘটনাবলী নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তিনি আশা করেছিলেন, হয়তো এর মাধ্যমে ইরানি শাসনের পতন ঘটবে এবং তিনি দেশে ফিরতে পারবেন। কিন্তু বাস্তবে তার ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল অন্যভাবে।

যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তে আটকের পর কয়েক মাস আইসিই ডিটেনশন সেন্টারে কাটানোর পর নিকা ক্যালিফোর্নিয়ায় মুক্তভাবে বসবাস করছিলেন। জুন মাসে তাকে একটি রুটিন মিটিংয়ে ডাকা হয়, কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১১ জুন তাকে হাতকড়া পরিয়ে ১৭ জন অভিবাসীর সাথে একটি বিমানে তুলে দেওয়া হয়। বিমানে ওঠার আগ পর্যন্ত তিনি জানতেন না তাকে কোথায় পাঠানো হচ্ছে। নিকার আইনজীবী সাহার জালিলি পাওয়েলস্কি তাকে বিমান থেকে নামিয়ে আনার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন।

নিকার মতো অনেক অভিবাসীর কাছেই মার্কিন বিচারকের দেওয়া সুরক্ষা আদেশ ছিল, যা তাদের এমন দেশে ফেরত পাঠানো থেকে রক্ষা করার কথা যেখানে তারা নির্যাতন বা মৃত্যুর ঝুঁকিতে রয়েছেন। তবে ট্রাম্প পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর এই পরিস্থিতি বদলে গেছে। তার প্রশাসনের দাবি, তারা আইন অনুযায়ী কাজ করছেন এবং যাদের বসবাসের অধিকার নেই, তাদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে।

বর্তমানে সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকের রাজধানী বাঙ্গুইতে অবস্থান করছেন নিকা। দুই মাসের বেশি সময় ধরে তিনি অ্যাপার্টমেন্টের বাইরে বের হতে ভয় পান। স্থানীয় পুলিশ প্রায়ই তাকে থামিয়ে ঘুষ দাবি করে এবং হুমকি দেয়। এছাড়া ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে তাকে হাসপাতালেও ভর্তি হতে হয়েছিল। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর নিজেও এই দেশটিতে ভ্রমণ না করার পরামর্শ দিয়ে থাকে, কারণ সেখানে অপহরণ, সন্ত্রাস ও অপরাধের ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি।

সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক কেন এই অভিবাসীদের গ্রহণ করতে রাজি হয়েছে, তা এখনো রহস্য। তবে ধারণা করা হচ্ছে, এর পেছনে আর্থিক লেনদেনের সম্পর্ক রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এই বছর দেশটিতে জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থার (IOM) কার্যক্রমে ৮৫ মিলিয়ন ডলার সহায়তা দিয়েছে, যা আগের বছরগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। এছাড়া দেশটির মানবিক তহবিলে আরও ৫০ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের মুখপাত্র জানিয়েছেন, অভিবাসন অগ্রাধিকার অর্জনে সহায়তাকারী দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র আর্থিক সহায়তা দেবে।

নিকা এবং তার সাথে আসা অভিবাসীদের মাত্র তিন মাসের অস্থায়ী আশ্রয়ের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। ৩১ জুলাই আরও ৩১ জনকে নিয়ে দ্বিতীয় একটি নির্বাসন ফ্লাইট সেখানে পৌঁছায়। নিকার আইনজীবী এখন একটি ফেডারেল মামলা দায়ের করছেন, যাতে তাকে পুনরায় যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে এনে তার আশ্রয়ের আবেদনটি নতুন করে বিবেচনা করা যায়। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম উদ্বেগের মধ্যে থাকা নিকা এখনো বুঝে উঠতে পারছেন না, যে দেশটিকে তিনি সুরক্ষার আশ্রয়স্থল মনে করেছিলেন, তারাই কেন তাকে এভাবে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিল।