জুলাই মাসে ওয়াশিংটন ডি.সি.-তে আমেরিকার ২৫০তম জন্মদিনের উৎসব শুরু হয়েছিল এক জরুরি অবস্থার মধ্য দিয়ে। ন্যাশনাল মলে আতশবাজি দেখার জন্য জড়ো হওয়া জনতাকে গ্রীষ্মকালীন ঝড়ের কারণে পার্ক থেকে সরিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে নিতে হয়। যদিও কয়েক ঘণ্টা পর অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন হয়েছিল, তবে প্রকৃতি যেন তার রুদ্ররূপের বার্তা দিয়ে রেখেছিল।
আমেরিকার কোটি কোটি মানুষের কাছে গ্রীষ্মকাল এখন আর ছুটির সময় নয়, বরং এটি যেন এক আতঙ্কের নাম। টেক্সাসে গত ১২ মাসের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো ‘সহস্রাব্দে একবার ঘটে’ এমন বন্যা দেখা দিয়েছে। ইন্ডিয়ানাতে রেকর্ড ৭৭টি টর্নেডো আঘাত হেনেছে, যা টর্নেডো অ্যালির বাইরে বিরল। এর পাশাপাশি ছিল অসহনীয় দাবদাহ। জুলাই মাসটি যুক্তরাষ্ট্রের নিম্ন ৪৮টি অঙ্গরাজ্যে ইতিহাসের উষ্ণতম মাস হিসেবে রেকর্ড গড়েছে, যা ডাস্ট বোলের সময়কার রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে।
ওয়াশিংটনের স্পোকেনে জুলাইয়ের তীব্র গরম, দীর্ঘ খরা এবং প্রবল বাতাসের কারণে ভয়াবহ দাবানল ছড়িয়ে পড়ে। টেড শভিনের এলাকায় আগুনের লেলিহান শিখা দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে তিনি তার পরিবার নিয়ে কোনোমতে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। তিনি জানান, কুকুর, বিড়াল ও সন্তানকে নিয়ে তারা দ্রুত এলাকা ত্যাগ করেন।
নিজের ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়ির ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকিয়ে শভিন বলেন, ‘এখানেই আমার ক্যান্সার ধরা পড়েছিল এবং আমি তা জয় করেছিলাম। এখানেই আমার সন্তানের বেড়ে ওঠার স্মৃতি। সবচেয়ে কঠিন বিষয় হলো সেই স্মৃতিগুলো, আর আমার সন্তানের কান্না—সে তার বাড়িকে খুব মিস করছে।’
ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যে এ বছরটি ইতিহাসের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক দাবানলের মৌসুম হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। শভিনের মতে, পরিস্থিতি বদলে যাচ্ছে এবং এখন সময় এসেছে এর প্রতিকারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার।
জলবায়ু বিষয়ক সাংবাদিক জেফ গুডেল তার ‘দ্য হিট উইল কিল ইউ ফার্স্ট’ এবং ‘দ্য ওয়াটার উইল কাম’ বইগুলোতে বর্তমানের এই চরম পরিস্থিতির পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ২০২৬ সালের এই গ্রীষ্মকাল আমাদের পৃথিবীর আরও উত্তপ্ত ও বিপজ্জনক হয়ে ওঠার একটি ধাপ মাত্র, যার বিষয়ে বিজ্ঞানীরা কয়েক দশক ধরেই সতর্ক করে আসছেন।
গুডেলের মতে, বর্তমানের এই চরম আবহাওয়া বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং একে অপরের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তিনি বলেন, আমরা একটি ভিন্ন পৃথিবী তৈরি করছি এবং আমাদের সেই নতুন পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। তবে সমস্যা সমাধানের আগে আমাদের স্বীকার করতে হবে যে একটি সংকট চলছে। মানুষ প্রায়ই একে ‘অস্বাভাবিক বছর’ বা ‘টেক্সাসে তো সবসময়ই গরম থাকে’ বলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, যা অনেকটা ফুটন্ত পাত্রে থাকা ব্যাঙের মতো—আমরা বিপদ বুঝতে পারার আগেই অনেক দেরি হয়ে যায়।
ইপিএ (EPA) এবং এনওএএ (NOAA)-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬০-এর দশকের তুলনায় বর্তমানে দাবদাহ তিন গুণ বেশি ঘটছে। এছাড়া, নব্বইয়ের দশকের তুলনায় বর্তমানে প্রতি বছর দ্বিগুণ পরিমাণ বনভূমি দাবানলে পুড়ে যাচ্ছে।
আটলান্টিকের ওপারে ইউরোপেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। সেখানে রেকর্ড দাবদাহ ও প্রাণঘাতী অগ্নিকাণ্ডে ১০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইউরোপে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা খুব একটা প্রচলিত নয়, কারণ সেখানে আগে কখনো এত দীর্ঘ সময় ধরে এমন তীব্র গরম পড়েনি।
জেফ গুডেল বলেন, মানব সভ্যতা গত ১০ হাজার বছর ধরে একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রা বা ‘গোল্ডিলকস জোন’-এ বিকশিত হয়েছে। এখন আমরা সেই সীমার বাইরে চলে যাচ্ছি। আমাদের অবকাঠামো ও নির্মাণের ধরনও এই নতুন জলবায়ুর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে কেন্দ্রীয় সরকারের সহায়তা ছাড়া শহরগুলোর পক্ষে এই পরিবর্তন মোকাবিলা করা কঠিন।
এদিকে, ট্রাম্পের আমলে ইপিএ গ্রিনহাউস গ্যাসের ওপর ‘এন্ডেঞ্জারমেন্ট ফাইন্ডিং’ বাতিল করেছে এবং গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের ওপর ফেডারেল বিধিনিষেধ শিথিল করেছে।
মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ুমণ্ডলীয় বিজ্ঞানী মারিয়া মোলিনা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অতীতের আবহাওয়া উপাত্ত ব্যবহার করে ভবিষ্যতের পূর্বাভাস দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তিনি জানান, চরম আবহাওয়া সবসময়ই ছিল, কিন্তু প্রশ্ন হলো জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই চরমভাব কতটা তীব্র হচ্ছে। ছোট কোনো পরিবর্তন যেমন দাবানলের মৌসুম দীর্ঘ হওয়া, পরিসংখ্যানের বিচারে সামান্য মনে হলেও এটি বড় ধরনের বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
টেড শভিন জানান, ওয়াশিংটনে আগে কখনো এমন ‘ধোঁয়াচ্ছন্ন মৌসুম’ ছিল না। তিনি এখন তার পরিবার নিয়ে স্পোকেনে থাকার সিদ্ধান্ত নিলেও, ভবিষ্যতে সেখানে ফিরে যাওয়া বা স্থায়ী হওয়া নিয়ে নিশ্চিত নন।
জেফ গুডেল তার মেয়ের সাথে বনের মধ্য দিয়ে হাঁটার সময় ভবিষ্যতের কথা ভেবে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। তিনি ভাবেন, তার মেয়ে যখন বড় হয়ে তার সন্তানদের নিয়ে এই পৃথিবীতে হাঁটবে, তখন পৃথিবীটা কেমন হবে? তারা হয়তো জানতে চাইবে, আমরা এই সংকট মোকাবিলায় কী করেছি বা কী করিনি।

