যুক্তরাজ্যের চেস্টার চিড়িয়াখানায় এক অভূতপূর্ব চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাফল্যের নজির স্থাপন করেছেন চিকিৎসকরা। মানুষের ক্যানসার চিকিৎসায় ব্যবহৃত বিশেষ পদ্ধতি প্রয়োগ করে ১৫ ফুট লম্বা একটি জালিকাবদ্ধ অজগরকে সুস্থ করে তোলা হয়েছে। জোডি ফস্টার নামের ২৩ বছর বয়সী এই অজগরটি বর্তমানে সম্পূর্ণ সুস্থ এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে। প্রায় ৪০ কেজি ওজনের এই সাপটির চোয়ালে ম্যালিগন্যান্ট টিউমার বা ফাইব্রোসারকোমা ধরা পড়েছিল, যা তার বেঁচে থাকার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
২০২৪ সালে চিড়িয়াখানার কর্মীরা লক্ষ্য করেন যে, জোডি স্বাভাবিকের তুলনায় খাবার কম খাচ্ছে। চিড়িয়াখানার চিকিৎসা কর্মকর্তা ইয়ান অ্যাশপোল জানান, টিউমারের কারণে সাপটির পক্ষে খাবার গেলা ক্রমশ অসম্ভব হয়ে পড়ছিল। অজগরের জন্য শিকার গিলে খাওয়ার ক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এরা নিজেদের মাথার চেয়েও বড় আকারের শিকার গিলে খাওয়ার সময় চোয়াল ব্যাপকভাবে প্রসারিত করে। এই শারীরিক সক্ষমতা বজায় রাখা জোডির বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য ছিল।
চিকিৎসার শুরুতে জোডিকে তার আবাসস্থলেই অচেতন করা হয় এবং পরে চিড়িয়াখানার চিকিৎসাকেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়। সাপটির বিশাল আকারের কারণে অস্ত্রোপচারের সময় দুটি অপারেশন টেবিল যুক্ত করতে হয়েছিল। প্রায় ৯০ মিনিটের দীর্ঘ অস্ত্রোপচারে টিউমার এবং চোয়ালের আক্রান্ত অংশ অপসারণ করা হয়। এরপর অবশিষ্ট ক্যানসার কোষ ধ্বংস করতে ইলেক্ট্রোকেমোথেরাপি দেওয়া হয়। এই পদ্ধতিতে ক্যানসারের ওষুধ ব্লিওমাইসিনের সঙ্গে নিয়ন্ত্রিত বৈদ্যুতিক তরঙ্গ ব্যবহার করা হয়েছে, যা নির্দিষ্ট কোষকে লক্ষ্য করে কাজ করে।
লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোট প্রাণীর চিকিৎসাবিজ্ঞান বিভাগের বিশেষজ্ঞ হোসে আলভারেজ পিকর্নেল জানিয়েছেন, এই চিকিৎসা পদ্ধতির বিস্তারিত তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে, যা ভবিষ্যতে প্রাণীদের চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। অস্ত্রোপচারের পর থেকে জোডির শারীরিক অবস্থার দ্রুত উন্নতি হয়েছে। চলতি সপ্তাহে করা সর্বশেষ পরীক্ষায় তার শরীরে ক্যানসার ফিরে আসার কোনো লক্ষণ পাওয়া যায়নি এবং সে আগের মতোই সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
ইয়ান অ্যাশপোল বলেন, কয়েক মাস আগেও তারা নিশ্চিত ছিলেন না যে জোডি বেঁচে থাকবে কি না। এখন তাকে স্বাভাবিকভাবে খেতে এবং নিজের আবাসস্থল ঘুরে বেড়াতে দেখে চিকিৎসকরা অত্যন্ত আনন্দিত। জোডি ফস্টারের নামটির পেছনেও রয়েছে মজার ইতিহাস। প্রায় দুই দশক আগে যখন সাপটি চিড়িয়াখানায় আসে, তখন তার কোনো নাম ছিল না। নথিপত্রে ‘JF’ লেখা দেখে কর্মীরা মজার ছলে হলিউড অভিনেত্রী জোডি ফস্টারের নামানুসারে তার নাম রাখেন।
এই সাফল্য কেবল একটি অজগরের জীবন বাঁচানোর গল্প নয়, বরং এটি প্রমাণ করে যে মানুষের জন্য উদ্ভাবিত জটিল চিকিৎসাপদ্ধতি কীভাবে প্রাণীদের চিকিৎসায় কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, অস্ত্রোপচারের পরও জোডির খাবার গেলার স্বাভাবিক ক্ষমতায় কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি, যা এই চিকিৎসার বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

