দুবাইয়ের ফায়ারেটি কনটেম্পোরারি গ্যালারি সিরীয় শিল্পী আহমেদ তাল্লার একক প্রদর্শনী ‘দ্য লিভিং আর্কাইভ’ আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছে। আগামী ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ১১ নভেম্বর পর্যন্ত চলা এই প্রদর্শনীতে শিল্পীর কাজের সবচেয়ে বড় সংগ্রহ তুলে ধরা হবে, যার মধ্যে রয়েছে বিশাল আকৃতির প্রতিকৃতি, ভাস্কর্য, টাইলস ইনস্টলেশন, কাগজে আঁকা কাজ এবং শিল্পীর নিজস্ব বই। কিউরেটর সেলিন আজেমের মতে, এমন কিছু জ্ঞান আছে যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না, কেবল বহন করা যায়। তিনি বলেন, এই জ্ঞান কেবল মস্তিষ্কে নয়, বরং শরীরের প্রতিটি ভাঁজে, চোখের কোণের রেখায় এবং মানুষের অঙ্গভঙ্গিতে লুকিয়ে থাকে। তাল্লার শিল্পকর্ম মূলত সেই অভিজ্ঞতার অবশিষ্টাংশ নিয়ে কাজ করে, যা সময়ের সাথে মানুষের শরীরে স্থায়ী ছাপ ফেলে যায়।
‘দ্য লিভিং আর্কাইভ’ মানুষের মুখকে অভিজ্ঞতার একটি আধার হিসেবে বিবেচনা করে। শিল্পী তাল্লা প্রশ্ন তুলেছেন, সময় আমাদের জীবনে কী রেখে যায় এবং সেই চিহ্নগুলো কীভাবে বয়ে বেড়াতে হয়। তিনি আর্কাইভকে কেবল অতীতের কোনো স্থির সংগ্রহ মনে করেন না, বরং একে একটি জীবন্ত সত্তা হিসেবে দেখেন যা সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়। প্রদর্শনীর শুরুতে রাখা হয়েছে শিল্পীর হাতে তৈরি বইগুলো, যা পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ, কাঁচা ক্যানভাস এবং পিগমেন্ট দিয়ে তৈরি। এগুলো ডায়েরি বা পরীক্ষামূলক রেকর্ডের মতো দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে, যেখানে প্রতিটি পৃষ্ঠায় পর্যবেক্ষণ ও নিরন্তর পরিবর্তনের ছাপ স্পষ্ট।
প্রদর্শনীতে থাকা প্রতিকৃতিগুলো প্রথাগত ধারার নয়; এখানে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির পরিচয় বা স্থির মনস্তত্ত্ব ফুটিয়ে তোলা হয়নি। তাল্লার ভাষায়, মুখাবয়ব কোনো ভুক্তভোগী বা বিজয়ী নয়, বরং এটি একটি সাক্ষী। এই কাজগুলো সংযুক্ত আরব আমিরাতের বালু, চক পাউডার, আঠা এবং অ্যাক্রিলিক দিয়ে তৈরি, যা প্রতিকৃতিগুলোকে ভাস্কর্যের মতো গভীরতা দিয়েছে। তাল্লা বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতে বসবাস করছেন, তাই তার কাজের বালু তার বর্তমান পরিবেশ এবং সিরিয়ার স্মৃতির এক মেলবন্ধন তৈরি করেছে। অতীত ও বর্তমান এখানে কেবল ধারণাগত নয়, বরং বস্তুগতভাবেও একীভূত হয়েছে।
শিল্পী তার টাইলস ইনস্টলেশনে পুনর্ব্যবহৃত কাঠের প্যানেল ব্যবহার করেছেন, যেখানে চারকোল ও পিগমেন্টের মাধ্যমে ঝাপসা মুখাবয়ব ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। প্রতিটি প্যানেল আলাদাভাবে অসম্পূর্ণ মনে হলেও, একত্রে সেগুলো এক অস্পষ্ট উপস্থিতির ক্ষেত্র তৈরি করে। তাল্লার ভাস্কর্যগুলোতেও একই ধরনের ফাটল ধরা ও ক্ষয়িষ্ণু বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। অনেক ভাস্কর্যই ঘুমের ভঙ্গিতে তৈরি, যা প্রশান্তি এবং বিচ্ছিন্নতার মধ্যবর্তী এক অবস্থাকে নির্দেশ করে। দামেস্কের সংঘাতময় জীবনের অস্থিরতা ও ধ্বংসস্তূপের ছাপ তার শিল্পকর্মে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে, যেখানে প্রতিকৃতিগুলো পুরোপুরি আকার পাওয়ার আগেই যেন বিলীন হয়ে যায়।
তাল্লার কাজের প্রক্রিয়াটি মূলত শারীরিক পরিশ্রমের ওপর নির্ভরশীল। তিনি নিজেই নিজের কাজের সরঞ্জাম তৈরি করেন এবং স্টুডিওর কাজকে কেবল শিল্প উৎপাদন নয়, বরং সৃজনশীল অনুসন্ধান হিসেবে দেখেন। তার প্রতিটি কাজে সময়ের চাপ এবং বাস্তবতার প্রতিরোধের ছাপ দৃশ্যমান। কোনো পূর্বনির্ধারিত ছক ছাড়াই তিনি কাজ করেন, যেখানে আকার ও আকৃতি কাজের অগ্রগতির সাথে সাথে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বেরিয়ে আসে।
লেখক ভেরোনিকা আজ্জারির মতে, ‘দ্য লিভিং আর্কাইভ’ অতীতকে সমাপ্ত কোনো বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করে না, বরং একে বর্তমানের একটি অংশ হিসেবে তুলে ধরে। তাল্লার মতে, প্রতিটি অভিজ্ঞতা একটি চিহ্ন রেখে যায় এবং প্রতিটি ক্ষত নতুন করে পরিচয় গড়ে দেয়। ১৯৯৪ সালে দামেস্কে জন্মগ্রহণকারী আহমেদ তাল্লা দামেস্কের ফ্যাকাল্টি অফ ফাইন আর্টস থেকে পড়াশোনা করেছেন। তিনি ২০১৭ ও ২০১৯ সালে সিরিয়ার সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে সেরা শিল্পকর্মের জন্য ‘স্প্রিং অ্যানুয়াল এক্সিবিশন অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেন। বর্তমানে তিনি শারজাহতে বসবাস ও কাজ করছেন।

