‘মামদানি মার্ট’ বিতর্ক আসলে মুদি দোকান নিয়ে নয়

নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি যখনই শহরে পাঁচটি সরকার-মালিকানাধীন সুপারমার্কেট চালুর পরিকল্পনা নিয়ে নতুন কোনো তথ্য দেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই ভেসে ওঠে সাবেক রুশ প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিনের একটি পুরোনো ছবি।

ছবিটি ১৯৮৯ সালের। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার কয়েক মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র সফরে এসে টেক্সাসের হিউস্টনের একটি সুপারমার্কেটে ঢুকেছিলেন ইয়েলৎসিন। সেখানে তাকভর্তি হিমায়িত খাবার, মাছ, পনির আর অসংখ্য পণ্যের বৈচিত্র্য দেখে তিনি বিস্মিত হয়েছিলেন।

পরে বিমানে বসে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রায় খালি দোকানের কথা ভেবে হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। তার জীবনী অনুযায়ী, তিনি বলেছিলেন, “আমাদের দরিদ্র মানুষদের সঙ্গে তারা কী করেছে?”

এই ঘটনা পরবর্তীতে মুক্তবাজার অর্থনীতির শক্তি বোঝাতে যুক্তরাষ্ট্রে এক ধরনের প্রতীক হয়ে ওঠে।

কেন এত বিতর্ক ‘মামদানি মার্ট’ নিয়ে

মামদানির পরিকল্পনা অনুযায়ী, নিউইয়র্ক সিটিতে পাঁচটি সরকার-মালিকানাধীন মুদি দোকান খোলা হবে। সমালোচকেরা এরই মধ্যে এগুলোকে ব্যঙ্গ করে ‘Mamdani marts’ বলতে শুরু করেছেন।

তাদের আশঙ্কা, সরকার পরিচালিত দোকান একসময় সোভিয়েত আমলের রাষ্ট্রীয় দোকানের মতো অদক্ষ, পণ্যস্বল্প এবং একঘেয়ে হয়ে উঠতে পারে।

অন্যদিকে সমর্থকদের যুক্তি, খাদ্যপণ্যের দাম যখন অনেক সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে, তখন সরকার সাশ্রয়ী দামে নিত্যপণ্য নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখতেই পারে।

ফলে বিতর্কটি আসলে ডিম, দুধ কিংবা কেচাপের দাম নিয়ে সীমাবদ্ধ নয়। এর কেন্দ্রে রয়েছে আরও বড় একটি প্রশ্ন: সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা সমাধানে সরকারের দায়িত্ব কতটা হওয়া উচিত?

সরকারের ভূমিকা নিয়ে দুই বিপরীত ধারণা

CUNY School of Public Health-এর সহযোগী অধ্যাপক নেভিন কোহেনের মতে, এই বিতর্ক মূলত দোকান কীভাবে পরিচালিত হবে, সেই প্রযুক্তিগত প্রশ্ন নিয়ে নয়।

বরং এটি দুই ধরনের রাজনৈতিক ধারণার পরীক্ষা।

একদল মনে করেন, বাজার যখন সাধারণ মানুষের প্রয়োজন পূরণে ব্যর্থ হয়, তখন সরকারের হস্তক্ষেপ করা উচিত। অন্যরা মনে করেন, সরকার ব্যবসার ক্ষেত্রে প্রবেশ করলে অদক্ষতা বাড়বে এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন বাজারব্যবস্থার ক্ষতি হবে।

মামদানির সমালোচকেরা পরিকল্পনাটিকে সমাজতান্ত্রিক নীতির সম্প্রসারণ হিসেবে দেখছেন। আর সমর্থকেরা বলছেন, এটি মূলত খাদ্যের উচ্চমূল্যে ভোগা মানুষের জন্য একটি বিকল্প ব্যবস্থা।

বাস্তবে পুরো বাজার দখলের পরিকল্পনা নয়

প্রস্তাবিত সরকারি দোকানগুলো সরাসরি সরকারি কর্মকর্তারা চালাবেন এমন নয়। শহর কর্তৃপক্ষ বেসরকারি অপারেটরদের মাধ্যমে দোকান পরিচালনা এবং খাদ্যপণ্য সংগ্রহের পরিকল্পনা করছে।

এমনকি নিউইয়র্কের মোট জনসংখ্যার খুব সামান্য অংশই এসব দোকানে কেনাকাটা করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অর্থাৎ শহরের বিশাল বেসরকারি মুদি বাজার, Walmart, Costco কিংবা অন্যান্য সুপারমার্কেট চেইনের জন্য এগুলো বড় ধরনের প্রতিযোগী হয়ে উঠবে, এমন সম্ভাবনা কম।

তারপরও বিষয়টি নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার কারণ সুপারমার্কেটের সঙ্গে আমেরিকার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিচয়ের দীর্ঘ সম্পর্ক।

সুপারমার্কেট আমেরিকার সমৃদ্ধির প্রতীক

যুক্তরাষ্ট্রে সুপারমার্কেট শুধু কেনাকাটার জায়গা নয়। কয়েক দশক ধরে এটি ভোক্তার স্বাধীনতা, পণ্যের প্রাচুর্য এবং পুঁজিবাদী অর্থনীতির প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

শীতল যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র বিদেশে নিজেদের জীবনযাত্রার মান তুলে ধরতে সুপারমার্কেটের ছবি প্রচার করত।

U.S. Information Agency দীর্ঘদিন বিভিন্ন দেশে তাকভর্তি মার্কিন সুপারমার্কেটের ছবি বিতরণ করেছে। উদ্দেশ্য ছিল ‘American way of life’-এর সমৃদ্ধি এবং ভোক্তার পছন্দের স্বাধীনতা তুলে ধরা।

৬ হাজার থেকে ৪৭ হাজার পণ্য

গত কয়েক দশকে মার্কিন সুপারমার্কেটের বৈচিত্র্যও ব্যাপকভাবে বেড়েছে।

১৯৬০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের একটি গড় সুপারমার্কেটে প্রায় ৬ হাজার ধরনের পণ্য পাওয়া যেত। ২০১০ সালের মধ্যে সেই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৪৭ হাজারে পৌঁছায়।

এরপর Walmart-এর সুপারসেন্টার, Costco-এর ওয়্যারহাউস মডেল এবং Trader Joe’s-এর মতো বিশেষায়িত দোকান বাজারে আরও বেশি পণ্যের বৈচিত্র্য নিয়ে আসে।

শপিং কার্ট, বারকোড এবং বৃহৎ পরিসরের খুচরা বিপণন ব্যবস্থাও মার্কিন সুপারমার্কেটকে আধুনিক ভোক্তা সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত করেছে।

খাবারও রাজনৈতিক প্রতীক

ইউনিভার্সিটি অব মিনেসোটার ইতিহাসবিদ ট্রেসি ডয়চের মতে, খাদ্য ও মুদি দোকান সবসময়ই মানুষের রাজনৈতিক চিন্তা ও সামাজিক অবস্থানের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক অধিকার আন্দোলনের সময়ও দোকান ও রেস্তোরাঁ রাজনৈতিক সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ছিল। কোভিড-১৯ মহামারির সময় মাস্ক পরা এবং দোকানে প্রবেশের নিয়ম নিয়েও তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক দেখা গেছে।

ফলে বর্তমান ‘মামদানি মার্ট’ বিতর্কও একই ঐতিহাসিক ধারার একটি নতুন অধ্যায়।

মুদি দোকানের আড়ালে বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন

সব মিলিয়ে নিউইয়র্কে পাঁচটি সরকারি সুপারমার্কেটের পরিকল্পনা বাস্তবে শহরের পুরো মুদি ব্যবসাকে পাল্টে দেওয়ার মতো বড় কোনো প্রকল্প নয়।

কিন্তু এটিকে ঘিরে যে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা দেখাচ্ছে বিষয়টি মুদি দোকানের চেয়ে অনেক বড়।

একপক্ষের কাছে এটি খাদ্যের উচ্চমূল্যে ভোগা মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সরকারি উদ্যোগ। অন্যপক্ষের কাছে এটি মুক্তবাজারে সরকারের অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ।

তাই ‘মামদানি মার্ট’ নিয়ে বিতর্ক আসলে মানুষ কোথা থেকে মুদি পণ্য কিনবে, সেই প্রশ্ন নয়; বরং আধুনিক আমেরিকায় সরকার ও বাজারের ভূমিকা কোথায় শেষ হবে, সেই পুরোনো রাজনৈতিক দ্বন্দ্বেরই নতুন রূপ।