কঠোর পরিশ্রমেও অধরা আমেরিকান স্বপ্ন, জীবনযাত্রার ব্যয়ে চাপে মধ্যবিত্ত

বছরের পর বছর অর্থনৈতিক তথ্য বিশ্লেষণ করেও ‘সাশ্রয়ী জীবন’ বা affordability আসলে কী, তা পুরোপুরি বোঝা কঠিন। যুক্তরাষ্ট্রের চারটি শহরে প্রায় ৫ হাজার মাইল ভ্রমণ, তিন ডজনের বেশি মানুষের সঙ্গে কথা বলা এবং তাদের জীবনের বাস্তবতা কাছ থেকে দেখার পর সেই ধারণা যেন নতুন অর্থ পেয়েছে।

ওহাইওর পারমা শহরের বাসিন্দা জোলিন সিমেচেক সেই বাস্তবতারই একটি মুখ।

৪২ বছর বয়সী এই একক মা ১৩ বছর বয়স থেকেই কাজ করছেন। তবুও নিজের একটি বাড়ির স্বপ্ন এখন তার কাছে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে।

একদিন গাড়ি চালাতে চালাতে তিনি দেখাচ্ছিলেন নতুন নতুন বাড়ির সারি। কিন্তু সেসব বাড়ি এত দ্রুত বিক্রি হয়ে যায় যে তার পক্ষে প্রস্তাব দেওয়ার সুযোগও আসে না। বাবা-মায়ের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে বড় কোনো সম্পদও পাননি।

ফলে তার সামনে বাস্তবতা একটাই: ভাড়া বাসায় থাকা, আরও বেশি কাজ করা, কখনও দিনে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত, অথচ হিসাবের ফল তবুও বদলায় না।

তিনি বলেন, তার চাওয়া খুব সাধারণ ছিল, সন্তানের জন্য একটি উঠানসহ বাড়ি। সেই পরিচিত ‘আমেরিকান ড্রিম’, একটি বাড়ি, সামনের ছোট বেড়া আর পরিবারের জন্য নিজের জায়গা। কিন্তু এখন সেটি বাস্তবের চেয়ে স্বপ্নই বেশি মনে হয়।

সাত বছরে ভাড়া দ্বিগুণেরও বেশি

জোলিনের পুরোনো অ্যাপার্টমেন্টের ভাড়া সাত বছরে ৭৮৫ ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ১,৬০০ ডলারে পৌঁছেছে। অথচ একই সময়ে তার আয় বাড়েনি।

পরিস্থিতি বদলাতে তিনি নার্সিং স্কুলে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এজন্য নিজের অ্যাপার্টমেন্ট ছেড়ে দেন এবং প্রায় ১৫ হাজার ডলার ঋণ নেন। স্বাস্থ্যসেবা খাতে কর্মীর ঘাটতিকে সামনে রেখে তিনি নিজের ভবিষ্যৎ বদলানোর চেষ্টা করছেন।

কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের মূল্যও কম নয়। এখন তিনি তার বোনের বাড়ির বেজমেন্টে থাকছেন। পরিবারের ছোট শিশুদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে হচ্ছে সেই জায়গা।

জোলিনের হিসাব অনুযায়ী, জীবনে তিনি ইতোমধ্যে প্রায় আড়াই লাখ ডলার ভাড়া দিয়েছেন। তার মনে হয়, এত অর্থ দিয়ে এখন পর্যন্ত নিজের বাড়ির একটি বড় অংশের মালিক হওয়া উচিত ছিল।

তবু নিজের অবস্থার জন্য অনেক সময় নিজেকেই দায়ী করেন তিনি। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, কঠোর পরিশ্রম করেও যদি সামনে এগোনো এত কঠিন হয়, তবে সমস্যাটি কি শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে?

‘Affordability’ শুধু একটি অর্থনৈতিক শব্দ নয়

‘Affordability’ এখন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে বহুল ব্যবহৃত একটি শব্দ। কিন্তু বাস্তবে এটি শুধু কোনো সূচক বা জরিপের সংখ্যা নয়।

এর পেছনে রয়েছে এমন পরিবার, যারা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকা আবাসন, শিশু যত্ন, চিকিৎসা এবং দৈনন্দিন ব্যয়ের চাপে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।

একদিকে মার্কিন শেয়ারবাজার নিয়মিত নতুন রেকর্ড গড়ছে। করপোরেট আয়, উৎপাদনশীলতা এবং ভোক্তা ব্যয়ও শক্তিশালী রয়েছে। যারা ইতোমধ্যে অর্থনৈতিকভাবে ভালো অবস্থায় আছেন, তাদের অনেকেই আরও ভালো করছেন।

অন্যদিকে সীমিত আয়ের পরিবারগুলো ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, অর্থনৈতিকভাবে উপরে ওঠার পথগুলোও অনেকের জন্য সংকুচিত হচ্ছে।

একটি বড় বিল নয়, ধারাবাহিক ব্যয়ই পরিবারকে ভাঙে

অনেক সময় ধারণা করা হয়, একটি জরুরি চিকিৎসা ব্যয় বা গাড়ির টায়ার নষ্ট হওয়াই কোনো পরিবারকে আর্থিক সংকটে ফেলতে পারে।

কিন্তু বাস্তবতা আরও গভীর।

মূল সমস্যা হলো আবাসন, শিশু যত্ন এবং ভবিষ্যৎ অবসর নিরাপত্তার মতো বড় ব্যয়গুলোর ধারাবাহিক বৃদ্ধি। এসব খরচ এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে পরিবারগুলো আর্থিকভাবে একেবারে সীমার কাছে এসে দাঁড়ায়।

তখন একটি ছোট জরুরি খরচও তাদের পুরো বাজেট ভেঙে দিতে পারে।

বদলে যাচ্ছে ‘আমেরিকান ড্রিম’

দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে একটি সামাজিক বিশ্বাস ছিল, পড়াশোনা করো, চাকরি নাও, কঠোর পরিশ্রম করো, বাড়ি কিনো, পরিবার গড়ে তোলো এবং ধীরে ধীরে সম্পদ তৈরি করো।

কিন্তু জীবনযাত্রার ব্যয়ের বর্তমান সংকট সেই বিশ্বাসকেই প্রশ্নের মুখে ফেলছে।

জোলিনের মতো অনেকেই নিয়ম মেনে চলেছেন, বছরের পর বছর কাজ করেছেন, তবু নিজের বাড়ি কেনা কিংবা আর্থিক নিরাপত্তা তৈরি করা তাদের নাগালের বাইরে থেকে যাচ্ছে।

এ কারণেই বর্তমান ‘affordability crisis’ কেবল জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ার গল্প নয়। এটি এমন এক বাস্তবতা, যেখানে পরিশ্রম ও স্থিতিশীল জীবনের মধ্যকার পুরোনো সম্পর্কটাই দুর্বল হয়ে পড়ছে।

আর সেই পরিবর্তন এখন শুধু অর্থনীতিতে নয়, যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাতেও গভীর প্রভাব ফেলছে।