ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণের লক্ষ্যে গত বছর গঠিত মার্কিন সেনাবাহিনীর একটি বিশেষ ড্রোন ব্যাটালিয়ন বন্ধের পরিকল্পনা করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার সেনাবাহিনীর এক কর্মকর্তা এই সিদ্ধান্তের কথা নিশ্চিত করেছেন। এই ইউনিটটি মূলত ড্রোন যুদ্ধের কৌশল আয়ত্ত করা এবং তা মার্কিন সামরিক সক্ষমতায় যুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছিল।
অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপট
বর্তমান ও সাবেক একাধিক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই ব্যাটালিয়নটি বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্তের পেছনে সেনাবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত চিফ অব স্টাফ জেনারেল ক্রিস্টোফার লানেভ এবং এই ইউনিটটির সমর্থক শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে দীর্ঘদিনের মতপার্থক্য কাজ করেছে। মূলত সাবেক আর্মি চিফ অব স্টাফ জেনারেল র্যান্ডি জর্জ এবং ইউএস আর্মি ইউরোপ ও আফ্রিকার সাবেক কমান্ডার জেনারেল ক্রিস্টোফার ডনাহু এই ইউনিটটি গঠনের পেছনে মূল ভূমিকা পালন করেছিলেন। তবে তাদের বিদায়ের পর লানেভের নেতৃত্বে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। লানেভ এবং ডনাহুর মধ্যে আগে থেকেই ব্যক্তিগত তিক্ততা ছিল, যা এই সিদ্ধান্তের পেছনে প্রভাব ফেলেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইউনিটের লক্ষ্য ও কার্যক্রম
‘আনম্যানড অ্যাসল্ট ব্যাটালিয়ন’ নামে পরিচিত এই ইউনিটটিকে ড্রোন যুদ্ধের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল, যাতে প্রয়োজনে যেকোনো স্থানে তাদের মোতায়েন করা যায়। ১৭৩তম এয়ারবোর্ন ব্রিগেডের অংশ হিসেবে এই ব্যাটালিয়নটি বর্তমানে একটি মহড়ায় অংশ নিচ্ছে, যা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে। এই মহড়ার মাধ্যমে তারা গত এক বছরে অর্জিত জ্ঞান সেনাবাহিনীর ভবিষ্যৎ যুদ্ধের কৌশলে যুক্ত করবে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও প্রতিক্রিয়া
- সেনাবাহিনীর এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মহড়া শেষে ইউনিটটি তাদের মূল কাজ ‘এয়ারবোর্ন ইনফ্যান্ট্রি ব্যাটালিয়ন’ হিসেবে পুনরায় কার্যক্রম শুরু করবে।
- সাবেক আর্মি চিফ অব স্টাফ জেনারেল জর্জ এবং আর্মি সেক্রেটারি ড্যান ড্রিসকল গত বছর ‘আর্মি ট্রান্সফরমেশন ইনিশিয়েটিভ’ চালু করেছিলেন, যেখানে ড্রোন প্রযুক্তির ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল।
- ড্রিসকল গত বছর ‘ফেস দ্য নেশন’ অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ইউক্রেনের যুদ্ধ থেকে শিক্ষা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
- ক্যাপ্টেন রোনান সেফটন, যিনি ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা নিয়ে কাজ করেছেন, তিনি ড্রোন প্রযুক্তির দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
- অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ডেভিড পেট্রাউস ড্রোন ব্যাটালিয়নের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেছিলেন, প্রথাগত আর্মার্ড ব্যাটালিয়নের পরিবর্তে ড্রোন ব্যাটালিয়ন গঠন করা সময়ের দাবি।
- জেনারেল লানেভ সম্প্রতি ‘দ্য আর্মি আজিমুথ’ নামে একটি নথি প্রকাশ করেছেন, যেখানে নতুন সক্ষমতা অর্জনের পাশাপাশি ড্রোন প্রতিরক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
- লানেভের মুখপাত্র এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন এবং বিষয়টি সেনাবাহিনীর ওপর ছেড়ে দিয়েছেন।
- ইউক্রেন যুদ্ধের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় ইরানের ড্রোন হামলার ঘটনাও ড্রোন যুদ্ধের গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
- এই ব্যাটালিয়ন বিলুপ্তির বিষয়টি প্রথম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল প্রকাশ করেছিল।
- সেনাবাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে এই পরিবর্তনটি মার্কিন সামরিক কৌশলের বিবর্তনের একটি বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
- লানেভ এবং ডনাহুর মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েন এই প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের একটি বড় কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
- সেনাবাহিনী বর্তমানে তাদের প্রথাগত সক্ষমতা বজায় রেখে আধুনিক ড্রোন প্রযুক্তির সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
ইউক্রেন যুদ্ধে ড্রোন ব্যবহারের যে ব্যাপকতা দেখা গেছে, তা আধুনিক যুদ্ধের সংজ্ঞাকে বদলে দিয়েছে। মার্কিন সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ড্রোন প্রযুক্তিকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তবে সেনাবাহিনীর বর্তমান নেতৃত্ব প্রথাগত যুদ্ধের কৌশলের ওপর বেশি জোর দিচ্ছে, যার ফলে এই বিশেষ ড্রোন ইউনিটটি বিলুপ্তির পথে। এই সিদ্ধান্তটি মার্কিন সামরিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, কারণ এটি ভবিষ্যতের যুদ্ধের প্রস্তুতির ক্ষেত্রে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।

