কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি বিপ্লব নাকি নিছক প্রচারণা? কর্মক্ষেত্রে এআই নিয়ে বাড়ছে বিতর্ক

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে বিশ্বজুড়ে চলছে তীব্র বিতর্ক। কারো কাছে এটি কর্মক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সহযোগী, আবার কারো কাছে এটি কেবল একটি উন্নত সার্চ ইঞ্জিন বা অতিরঞ্জিত প্রযুক্তির নাম। এই প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো একক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারছেন না বিশেষজ্ঞ বা সাধারণ ব্যবহারকারীরা।

প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন যে, এআই কর্মসংস্থানে এক নতুন শিল্প বিপ্লব ঘটাবে। অন্যদিকে, সমালোচকরা একে কেবল বিপণন কৌশলের অংশ বলে মনে করছেন। সম্প্রতি একজন এআই সিইও এবং বিনিয়োগকারীর ভাইরাল হওয়া একটি প্রবন্ধ এই বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, কম্পিউটারের সামনে বসে কাজ করা যেকোনো পেশা এআইয়ের হুমকির মুখে রয়েছে।

মেনলো ভেঞ্চারসের অংশীদার এবং অ্যানথ্রপিকসহ বিভিন্ন এআই কোম্পানির বিনিয়োগকারী ম্যাট মারফি মনে করেন, এই মতভেদের মূল কারণ হলো প্রযুক্তির ব্যবহারের ক্ষেত্রে মানুষের অভিজ্ঞতার ভিন্নতা। তিনি বলেন, “মানুষ এই প্রযুক্তির সংস্পর্শে কতটা এসেছে বা কতটা ব্যবহার করেছে, তার একটি বিশাল পরিসর রয়েছে। আর এই পরিস্থিতি খুব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে।”

এআইয়ের সক্ষমতা নিয়ে বিভ্রান্তির আরেকটি বড় কারণ হলো ফ্রি এবং পেইড ভার্সনের পার্থক্য। পেইড ভার্সনে ব্যবহারকারীরা এমন সব ‘এজেন্ট’ ব্যবহারের সুযোগ পান, যা কেবল চ্যাটবটের চেয়েও বেশি কার্যকর। উদাহরণস্বরূপ, অ্যানথ্রপিকের ‘ক্লদ কো-ওয়ার্ক’ এজেন্ট বা ওপেনএআইয়ের কোডেক্স কোডিং এজেন্ট শুধুমাত্র মাসিক ২০ ডলার বা তার বেশি মূল্যের সাবস্ক্রিপশন প্ল্যানে পাওয়া যায়।

বিনিয়োগকারী ম্যাট শুমার দাবি করেছেন, তার ব্যবহৃত এআই মডেলটি অ্যাপ তৈরি, ইউজার ফ্লো ডিজাইন এবং হাজার হাজার লাইন কোড লিখতে সক্ষম। তবে ২০২৪ সালে এআই মডেলের সক্ষমতা অতিরঞ্জিত করার অভিযোগে সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন তিনি। পরবর্তীতে তিনি একে তার পেশাগত জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল হিসেবে স্বীকার করেন। শুমার জানান, তিনি মূলত ওপেনএআইয়ের জিপিটি-৫.৩ কোডেক্স টুল ব্যবহার করে মাঝারি থেকে উচ্চ জটিলতার অ্যাপ নিয়ে পরীক্ষা চালাচ্ছেন।

কার্নেগি মেলন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এমিলি ডিজেউ মনে করেন, শুধুমাত্র ফ্রি এআই পরিষেবার ওপর ভিত্তি করে এই প্রযুক্তির সক্ষমতা নিয়ে ধারণা করা ভুল। ইউনিভার্সিটি অফ ওয়াশিংটনের অধ্যাপক ইমেরিটাস ওরেস এৎজিওনি ফ্রি এবং পেইড এআইয়ের পার্থক্যকে একজন অনভিজ্ঞ ইন্টার্ন এবং একজন অভিজ্ঞ কর্মীর সাথে তুলনা করেছেন। তার মতে, ফ্রি এআই ভালো সারাংশ বা কন্টেন্ট তৈরি করতে পারলেও, গভীর গবেষণা বা জটিল নথিপত্র তৈরির জন্য পেইড ভার্সন প্রয়োজন। তিনি সতর্ক করে বলেন, ফ্রি এআই চমৎকার পরামর্শ দিলেও একে আইনজীবী বা প্যারালিগাল হিসেবে ব্যবহার করা ঝুঁকিপূর্ণ।

তবে এআই কোম্পানিগুলো এখন তাদের উন্নত ফিচারগুলো ফ্রি টায়ারেও নিয়ে আসছে। স্ট্যানফোর্ড ইনস্টিটিউট ফর হিউম্যান সেন্টারড এআই-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা জেমস ল্যান্ডে বলেন, ফ্রি এবং পেইড এআইয়ের মধ্যে এখন আর বড় কোনো পার্থক্য নেই। উদাহরণস্বরূপ, অ্যানথ্রপিক সম্প্রতি ‘সনেট ৪.৬’ মডেল উন্মোচন করেছে, যা তাদের পেইড ভার্সনের উন্নত ‘ওপাস’ মডেলের কাছাকাছি পারফরম্যান্স দিতে সক্ষম।

এআই নিয়ে সংশয়বাদীদের মতে, এই প্রযুক্তির সক্ষমতা নিয়ে অনেক সময় অতিরঞ্জিত দাবি করা হয়। গত বছরের জুলাই মাসে মডেল ইভালুয়েশন অ্যান্ড থ্রেট রিসার্চের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ডেভেলপাররা এআই ব্যবহার করলে তাদের কোডিংয়ের কাজে ১৯ শতাংশ বেশি সময় ব্যয় হয়। জেমস ল্যান্ডে মনে করেন, কোডিংয়ের মতো যৌক্তিক কাঠামোর কাজে এআই ভালো কাজ করলেও, সব পেশার কাজের ধরন এমন নয়। তাই কোডিংয়ে এআইয়ের সাফল্যকে অন্য পেশায় এর সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে ধরা ঠিক হবে না।