বিশ্বজুড়ে এখন পরীক্ষার মৌসুম মানেই শিক্ষার্থীদের জন্য এক গোপন ও তীব্র মানসিক চাপের সময়। তবে চলতি বছর এই উদ্বেগ কেবল পারিবারিক গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা বিভিন্ন দেশে বড় ধরনের জনবিক্ষোভে রূপ নিয়েছে। মেক্সিকো, পর্তুগাল ও ভারতের মতো দেশগুলোতে পরীক্ষার স্বচ্ছতা ও পদ্ধতি নিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ রাজপথে নেমে এসেছে।
মেক্সিকোতে প্রায় ৬০ হাজার বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীকে পুনরায় পরীক্ষায় বসতে বাধ্য করা হয়েছে, কারণ আগের পরীক্ষায় ব্যাপক জালিয়াতির সন্দেহ দেখা দেয়। অন্যদিকে, পর্তুগালে পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের পদ্ধতি ডিজিটালাইজ করার একটি ব্যর্থ উদ্যোগ দেশটিতে গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় শিক্ষাসংকট তৈরি করেছে। এই ঘটনায় দেশটির শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি জোরালো হয়েছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে ভারতে। সেখানে একটি বড় ধরনের প্রশ্নফাঁসের ঘটনা লাখ লাখ শিক্ষার্থীকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এই ঘটনার সঙ্গে এক ডজনেরও বেশি শিক্ষার্থীর প্রাণহানির সম্পর্ক রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই কেলেঙ্কারি দেশটির শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগে বাধ্য করেছে এবং নরেন্দ্র মোদির সরকারের ওপর বড় ধরনের রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে জালিয়াতি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অপরিকল্পিত ডিজিটালাইজেশন এই অস্থিরতার মূল কারণ। প্রতিযোগিতামূলক চাকরির বাজারে ভালো ফলের চাপের সঙ্গে যখন এই প্রযুক্তিগত ত্রুটি যুক্ত হয়, তখন পরিস্থিতি বিস্ফোরক হয়ে ওঠে। ক্যালগারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়ার্কলুন্ড স্কুল অব এডুকেশনের অধ্যাপক ড. সারা ইটন বলেন, বিশ্বজুড়ে পরীক্ষাগুলো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি জটিল ও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।
ইটনের মতে, একটি মাত্র পরীক্ষার ফলের ওপর যখন কারো পুরো ভবিষ্যৎ নির্ভর করে, তখন তা শিক্ষার্থীদের ওপর অসহনীয় চাপ তৈরি করে। তিনি আরও বলেন, যখন কোনো পরীক্ষার ফল কারো জীবনের শেষ পরিণতি নির্ধারণ করে দেয়, তখন জালিয়াতি কেবল ব্যক্তিগত অপরাধ থাকে না, বরং তা একটি পদ্ধতিগত সংকটে পরিণত হয়। বিশেষ করে ভারতে ‘এডুকেশন মাফিয়া’ নামে পরিচিত চক্রগুলো শিক্ষার্থীদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে প্রশ্নপত্র চুরি ও বিক্রির মতো অপরাধ করছে।
ভারতে ‘কোকরোচ জনতা পার্টি’ নামক একটি যুব সংগঠন এই বিক্ষোভের নেতৃত্ব দিচ্ছে। অনলাইনে ব্যঙ্গাত্মক কৌতুক থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন দেশজুড়ে এক শক্তিশালী গণআন্দোলনে রূপ নিয়েছে। ইটন মনে করেন, বড় ধরনের জালিয়াতি ও পদ্ধতিগত ব্যর্থতা যখন একসঙ্গে ঘটে, তখন জনগণের আস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে, যা পুনরুদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব।
পর্তুগালের শিক্ষামন্ত্রী ফার্নান্দো আলেকজান্দ্রে খাতা মূল্যায়নের প্রক্রিয়া পুরোপুরি ডিজিটালাইজ করার চেষ্টা করলে বড় ধরনের ত্রুটি দেখা দেয়। এর ফলে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে তার পদত্যাগ দাবি করেছেন। মেক্সিকোর ন্যাশনাল অটোনোমাস ইউনিভার্সিটি অব মেক্সিকোতে অস্বাভাবিক বেশি নম্বর পাওয়ার কারণে জালিয়াতির সন্দেহ তৈরি হয়, যার ফলে ৫৮ হাজার শিক্ষার্থীকে পুনরায় পরীক্ষা দিতে হচ্ছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এখন এআই-এর অপব্যবহার রোধে নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। ডেনমার্ক নতুন শিক্ষাবর্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের লিখিত প্রবন্ধের ওপর মৌখিক পরীক্ষার ব্যবস্থা করেছে। অধ্যাপক ইটন মনে করেন, এআই কয়েক সেকেন্ডেই নিখুঁত প্রবন্ধ লিখে দিতে পারে, তাই প্রবন্ধ এখন আর শিক্ষার্থীর মেধা যাচাইয়ের কার্যকর উপায় নয়। তিনি শিক্ষাব্যবস্থায় মূল্যায়নের নতুন পদ্ধতি খোঁজার ওপর জোর দিয়েছেন।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের কম্পিউটার বিজ্ঞানী ড. টমাস ল্যাঙ্কাস্টার জানান, জালিয়াতি এখন অনেক বেশি প্রযুক্তি-নির্ভর হয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীরা এখন ইয়ারপিস বা ক্ষুদ্র ক্যামেরার মতো ‘স্পাই টেকনোলজি’ ব্যবহার করছে। পরীক্ষার হলে বাইরে থেকে বিশেষজ্ঞ বা এআই-এর সহায়তায় সরাসরি উত্তর পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা আগে কল্পনাও করা যেত না।
অধ্যাপক ইটন আরও বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রযুক্তির মাধ্যমে সস্তায় জালিয়াতি ঠেকানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু তারা শিক্ষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণে ব্যর্থ হচ্ছে। এই বিশাল আকারের গণপরীক্ষাগুলো শিক্ষাদান ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়াকে অমানবিক করে তুলছে। তার মতে, পরীক্ষার ফলের চেয়ে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শিক্ষা অর্জনই হওয়া উচিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

