ফ্রান্সে তরুণ প্রজন্মের মাঝে সাড়া ফেলেছে চার্লস দ্য গলের জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্র

১৯৪০ সালের ১৮ জুন, তৎকালীন স্বল্প পরিচিত সেনা কর্মকর্তা চার্লস দ্য গল লন্ডনের বিবিসি স্টুডিও থেকে নাৎসি দখলদারিত্ব এবং তাদের পুতুল ভিশি সরকারের বিরুদ্ধে ফরাসিদের প্রতিরোধ গড়ে তোলার ঐতিহাসিক ডাক দিয়েছিলেন। সেই সময় থেকেই তিনি ফ্রান্সের স্বাধীনতার প্রতীক হয়ে ওঠেন।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের চোখে দ্য গল ছিলেন একগুঁয়ে, উদ্ধত এবং মিত্রশক্তির জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। তবে এই ফরাসি নেতা ফ্রান্সের মহানুভবতা এবং প্রতিরোধের প্রয়োজনীয়তার ওপর সবসময় অবিচল আস্থা রেখেছিলেন।

বর্তমানে ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ জুলিয়ান জ্যাকসনের লেখা ২০১৮ সালের জীবনীগ্রন্থ ‘আ সার্টেন আইডিয়া অফ ফ্রান্স: দ্য লাইফ অফ চার্লস দ্য গল’-এর ওপর ভিত্তি করে নির্মিত দুই পর্বের একটি চলচ্চিত্র ফ্রান্সে অপ্রত্যাশিতভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এটি ফ্রান্সের তরুণ প্রজন্মের কাছে তাকে এক নতুন নায়কে পরিণত করেছে।

‘লা বাতায় দ্য গল’ (La Bataille de Gaulle) শিরোনামের এই চলচ্চিত্রটি জুন মাসে মুক্তির পর থেকে প্রায় ৫০ লাখ দর্শক দেখেছেন। এটি হলিউডের ব্লকবাস্টার সিনেমা ‘স্পাইডার-ম্যান: ব্র্যান্ড নিউ ডে’ এবং ‘দ্য ওডিসি’-এর সাথে পাল্লা দিচ্ছে। সিনেমাটি ২৮ আগস্ট এবং ১৯ সেপ্টেম্বর যুক্তরাজ্যে মুক্তি পাবে।

প্যান্থিয়ন-সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং ‘দ্য গল, ফ্রান্স অ্যান্ড দ্য ওয়ার্ল্ড’ বইয়ের সহ-লেখক আলিয়া আগলান বলেন, ফ্রান্সের ইতিহাসে সবসময়ই একজন ‘প্রভিডেনশিয়াল ম্যান’ বা ত্রাণকর্তার আবির্ভাব ঘটেছে, যিনি দুর্বল পরিস্থিতিকে শক্তিতে রূপান্তর করতে পারেন।

আগলান আরও বলেন, তরুণদের মধ্যে এই চলচ্চিত্রের জনপ্রিয়তা প্রমাণ করে যে তারা এমন একটি ইতিহাস সম্পর্কে জানছে যা তাদের অজানা ছিল। দ্য গল এমন একজন মানুষ ছিলেন যিনি ব্যর্থতা ও দ্বিধার মধ্য দিয়েও প্রতিরোধের চেতনাকে ধারণ করেছিলেন।

চলচ্চিত্রটির প্রতিটি পর্ব প্রায় তিন ঘণ্টা দীর্ঘ এবং এটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৮ কোটি পাউন্ড। প্রথম পর্ব ‘ল’আজে দ্য ফের’ (লৌহ যুগ) ১৯৪০ সালের জুনে দ্য গলের লন্ডন যাত্রা এবং ফ্রি ফ্রেঞ্চ বাহিনী গঠনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে।

এই পর্বে লিবিয়ার মরুভূমিতে ‘ব্যাটল অফ বির হাকাইম’-এর ঘটনাটি বিশেষভাবে ফুটে উঠেছে, যেখানে ৩,৭০০ ফ্রি ফ্রেঞ্চ সৈন্য এরউইন রোমেলের নেতৃত্বাধীন ৩৭,০০০ নাৎসি বাহিনীর বিরুদ্ধে ১৬ দিন লড়াই করে ব্রিটিশ অষ্টম বাহিনীকে পিছু হটার সুযোগ করে দিয়েছিল।

দ্বিতীয় পর্ব ‘জেক্রি তোঁ নোম’ (আমি তোমার নাম লিখছি) ১৯৪৪ সালে ফ্রান্সের মুক্তি পর্যন্ত যুদ্ধের বাকি অংশকে কভার করে। চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেছেন ফরাসি কূটনীতিক ও সাবেক মন্ত্রী পর্যায়ের উপদেষ্টা আন্তোনিন বোদ্রি।

অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে রয়েছেন সাইমন আবকারিয়ান, যিনি জেনারেল দ্য গলের চরিত্রে অভিনয় করেছেন এবং ব্রিটিশ শেক্সপিয়রীয় অভিনেতা সাইমন রাসেল বিল চার্চিলের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। বোদ্রি জানান, তিনি তরুণদের কাছে যুদ্ধ, প্রতিরোধ এবং অঙ্গীকারের বিষয়গুলো পৌঁছে দিতে চেয়েছেন।

প্রাথমিকভাবে সিনেমাটি ফ্লপ হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও, তরুণ দর্শকদের আকৃষ্ট করতে পাথী ফিল্মস ইউটিউব ও ইনস্টাগ্রাম ইনফ্লুয়েন্সার ইনক্সট্যাগের মাধ্যমে বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করে। স্থানীয় কাউন্সিলগুলো শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে টিকিটের ব্যবস্থা করায় সিনেমাটির জনপ্রিয়তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

আগামী বছর ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক বিভাজন যখন তীব্র, তখন দ্য গলের চরিত্রটি তরুণদের কাছে নতুন অর্থ নিয়ে এসেছে। আগলান বলেন, যখন মানুষ চরম ডানপন্থী বা বামপন্থীদের মধ্যে কাউকে বেছে নিতে চায় না, তখন তারা এমন একজন ত্রাণকর্তাকে খোঁজে যিনি তাদের এই কঠিন পরিস্থিতি থেকে বাঁচাতে পারেন।

তবে সব সমালোচক এই চলচ্চিত্রকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন না। ইতিহাসবিদ আর্নউড তেইসিয়ার এই বায়োপিককে একটি ‘কমিক স্ট্রিপ’ হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, এটি মূল চরিত্রের প্রতি সুবিচার করতে পারেনি।

পাথী ফিল্মসের বিতরণ বিভাগের উপ-মহাপরিচালক নাথালি সিউতাত জানান, তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিরোধের থিমটিই তরুণদের কাছে এই সিনেমাকে জনপ্রিয় করে তুলেছে। কারণ দ্য গল আশা জাগান, আর বর্তমান সময়ে সবাই প্রতিরোধের পথ খুঁজছে।