এআইয়ের কারণে বাড়ছে জীবনযাত্রার খরচ, চাপ বিদ্যুৎ থেকে ইলেকট্রনিকসেও

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ভবিষ্যতে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নতুন শিল্প গড়ে তোলার বড় সম্ভাবনা তৈরি করেছে। কিন্তু সেই দীর্ঘমেয়াদি সুফলের আগে সাধারণ মানুষকে এখনই কিছু বাড়তি খরচের চাপ সামলাতে হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রে এআই অবকাঠামো গড়ে তুলতে বিপুল বিনিয়োগের কারণে বিদ্যুৎ, কম্পিউটার চিপ, ইলেকট্রনিক পণ্য, সফটওয়্যার এবং নির্মাণ ব্যয়ের ওপর চাপ বাড়ছে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার জীবনযাত্রার ব্যয়েও পড়ছে।

চলতি বছর শুধু এআই গ্রহণ ও অবকাঠামো সম্প্রসারণে প্রায় ৭৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

মুডিস অ্যানালিটিকসের প্রধান অর্থনীতিবিদ মার্ক জান্ডির হিসাবে, এআইয়ের কারণে তৈরি মূল্যস্ফীতির প্রভাবে একটি মার্কিন পরিবারকে গত বছরের একই পণ্য ও সেবা কিনতে এখন বছরে ৩৭৫ ডলারেরও বেশি অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।

তবে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতে এআইয়ের অবদান এখনো তুলনামূলক সীমিত, আনুমানিক ০.২ শতাংশ পয়েন্ট। সমস্যা হলো, এই চাপ ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হতে পারে।

বিদ্যুতের চাহিদা বাড়াচ্ছে বিশাল ডেটা সেন্টার

এআই পরিচালনার জন্য প্রয়োজন বিশাল ডেটা সেন্টার। এসব কেন্দ্র বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ও পানি ব্যবহার করে।

যুক্তরাষ্ট্রে ডেটা সেন্টারের দ্রুত সম্প্রসারণের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা উৎপাদন ক্ষমতার তুলনায় দ্রুত বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে নতুন ডেটা সেন্টার যে গতিতে নির্মাণ করা যায়, সেই তুলনায় প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ উৎপাদন অবকাঠামো তৈরি করতে দুই থেকে তিন গুণ বেশি সময় লাগে।

এর সঙ্গে পুরোনো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হওয়া, বৈদ্যুতিক প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি, চরম আবহাওয়া এবং পুরোনো বিদ্যুৎ অবকাঠামোর চাপ যুক্ত হয়েছে।

বার্কলেসের মার্কিন অর্থনীতিবিদ পূজা শ্রীরাম বলেন, ডেটা সেন্টারগুলো বিপুল বিদ্যুৎ কিনছে এবং এজন্য বেশি দাম দিতেও প্রস্তুত। ফলে পাইকারি বিদ্যুতের দাম বেড়ে শেষ পর্যন্ত আবাসিক গ্রাহকদের বিলেও তার প্রভাব পড়ছে।

জুনে যুক্তরাষ্ট্রে বিদ্যুতের দাম এক মাসে ১ শতাংশ কমলেও এক বছর আগের তুলনায় তা এখনো প্রায় ৪ শতাংশ বেশি

এআইয়ের চাহিদায় দাম বাড়ছে মেমোরি চিপের

এআই ডেটা সেন্টারের জন্য শুধু বিদ্যুৎ নয়, বিপুল পরিমাণ উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন মেমোরি ও স্টোরেজ চিপও প্রয়োজন।

ফলে চিপ নির্মাতারা সাধারণ ভোক্তা পণ্যে ব্যবহৃত মেমোরি তৈরির পরিবর্তে বেশি লাভজনক উচ্চগতির এবং উচ্চ ব্যান্ডউইথের মেমোরি উৎপাদনে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

এর কারণে ল্যাপটপ, কম্পিউটার, স্মার্টফোন ও ট্যাবলেটে ব্যবহৃত সাধারণ মেমোরি চিপের সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে।

জুন পর্যন্ত এক বছরে সেমিকন্ডাক্টর ও সংশ্লিষ্ট ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশের পাইকারি মূল্য প্রায় ২৬ শতাংশ বেড়েছে। অথচ ২০২৫ সালের জুনে একই খাতে দাম বার্ষিক হিসাবে শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ কমেছিল।

কম্পিউটার ও গেমিং কনসোলও হচ্ছে দামি

মেমোরি ও অন্যান্য যন্ত্রাংশের দাম বৃদ্ধির প্রভাব ইতোমধ্যেই ভোক্তা ইলেকট্রনিকস বাজারে দেখা যাচ্ছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, অ্যাপল সম্প্রতি জনপ্রিয় কয়েকটি পণ্যের দাম প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি মেমোরি ও স্টোরেজের চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার পেছনে এআই ডেটা সেন্টারের সম্প্রসারণকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

সনি বছরের শুরুতে প্লেস্টেশন কনসোলের দাম বাড়িয়েছে। মাইক্রোসফটও কিছু এক্সবক্স কনসোলের দাম প্রায় ২৫ শতাংশ বাড়িয়েছে

সাধারণত প্রযুক্তিগত উন্নতির কারণে একই দামে আগের চেয়ে বেশি শক্তিশালী কম্পিউটার পাওয়া যায়। ফলে কম্পিউটার পণ্যের দাম দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতির পরিবর্তে কমার প্রবণতা দেখিয়েছে।

কিন্তু ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে কম্পিউটার ও সংশ্লিষ্ট হার্ডওয়্যারের দাম উল্টো বেড়েছে।

সফটওয়্যারেও যুক্ত হচ্ছে এআইয়ের বাড়তি খরচ

শুধু হার্ডওয়্যার নয়, সফটওয়্যারেও এআই ফিচার যুক্ত হওয়ায় ব্যবহারকারীদের খরচ বাড়ছে।

উদাহরণ হিসেবে প্রতিবেদনে মাইক্রোসফটের Office 365-এর কথা বলা হয়েছে। প্রায় এক দশক দাম অপরিবর্তিত রাখার পর প্রতিষ্ঠানটি ফেব্রুয়ারিতে ব্যক্তিগত প্ল্যানের দাম ৪৩ শতাংশ এবং ফ্যামিলি প্ল্যানের দাম প্রায় ৩০ শতাংশ বাড়িয়েছে।

নতুন দামের সঙ্গে মাইক্রোসফটের এআই টুল Copilot যুক্ত হয়েছে।

নির্মাণ খাতেও বাড়ছে চাপ

বিশাল ডেটা সেন্টার নির্মাণে তামা, বৈদ্যুতিক তার এবং অন্যান্য নির্মাণসামগ্রীর বিপুল চাহিদা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে প্রয়োজন হচ্ছে দক্ষ নির্মাণশ্রমিক।

এর ফলে নির্মাণশ্রমিকদের মজুরিও অন্যান্য অনেক খাতের তুলনায় দ্রুত বাড়ছে বলে অর্থনীতিবিদরা লক্ষ্য করছেন।

ম্যাককুয়ারি গ্রুপের থিয়েরি উইজম্যানের মতে, ডেটা সেন্টার নির্মাণের কারণে শ্রমিক ও নির্মাণসামগ্রীর ওপর চাপ বাড়লে তার প্রভাব আবাসন খাতেও পড়তে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ির দাম ও আবাসন ব্যয় আগে থেকেই বড় সমস্যা। নির্মাণশ্রমিকের মজুরি ও উপকরণের দাম আরও বাড়লে নতুন বাড়ি তৈরির ব্যয় বাড়তে পারে, যা আবাসনকে আরও ব্যয়বহুল করে তুলতে পারে।

সামনে চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা

এআই এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির প্রধান কারণ নয়। কিন্তু এর প্রভাব ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ, চিপ, ইলেকট্রনিকস, সফটওয়্যার ও নির্মাণ খাতে দৃশ্যমান হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এআই অবকাঠামোয় বিনিয়োগ আরও বাড়লে এই মূল্যচাপ অন্যান্য খাতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

ফলে যে প্রযুক্তি ভবিষ্যতে অর্থনীতিকে আরও উৎপাদনশীল ও সমৃদ্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, সেই এআই-ই আপাতত অনেক মার্কিন পরিবারের বিদ্যুৎ বিল থেকে শুরু করে কম্পিউটার কেনা পর্যন্ত দৈনন্দিন জীবনকে আরও ব্যয়বহুল করে তুলছে।