সিয়াটলে মূল্যস্ফীতির চাপে নাকাল মধ্যবিত্ত, টিকে থাকাই বড় চ্যালেঞ্জ

যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলে জীবনযাত্রার ব্যয় এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অনেক কর্মজীবী পরিবার এখন দৈনন্দিন খরচ সামলাতেই হিমশিম খাচ্ছে। জ্বালানি, বিদ্যুৎ, খাবার, বাসাভাড়া ও চিকিৎসা ব্যয় বাড়তে বাড়তে বহু মানুষের জন্য ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী থাকাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

ওয়াশিংটনের টাকোমায় বসবাসকারী ব্রিটনি জনসন এখন ভোর ৩টা ৫০ মিনিটে অ্যালার্ম দেন। কারণ সিয়াটলে কর্মস্থলে পৌঁছাতে তাকে বাস ধরতে হয়, আর প্রতিদিন যাওয়া-আসায় প্রায় ৭৪ মাইল পথ পাড়ি দিতে হয়।

আগে তিনি গাড়ি চালিয়ে মেটার সিয়াটল অফিসে যেতেন, যেখানে তিনি লাইন কুক হিসেবে কাজ করেন। কিন্তু বসন্তে পেট্রোলের দাম বাড়তে বাড়তে গ্যালনপ্রতি ৫.৮৯ ডলারে পৌঁছালে তিনি গাড়ি চালানো কমিয়ে দেন।

জাতীয় গড়ের চেয়েও বেশি মূল্যস্ফীতি

সিয়াটলে জুন মাসে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৪.৫ শতাংশ, যা জাতীয় গড়ের চেয়ে পুরো এক শতাংশ পয়েন্ট বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের বড় শহরগুলোর মধ্যে সে সময় কেবল ফিলাডেলফিয়াতেই মূল্যস্ফীতি আরও বেশি ছিল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সিয়াটলে মূল্যস্ফীতি বাড়ার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে জ্বালানি ও গৃহস্থালি বিদ্যুতের খরচ।

সিয়াটল এলাকায় সাধারণ পেট্রোলের গড় দাম বর্তমানে গ্যালনপ্রতি প্রায় ৫.৩০ ডলার, যা জাতীয় গড়ের তুলনায় এক ডলারেরও বেশি।

ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক অর্থনীতির অধ্যাপক ভিক্টর মেনালদোর মতে, খাদ্যের দামও চাপ তৈরি করছে, তবে জ্বালানি খরচ বৃদ্ধিই বর্তমান সংকটের বড় অংশ।

ঘণ্টায় ৩০ ডলারের বেশি আয়, তবু টানাটানি

ব্রিটনি জনসন ঘণ্টায় ৩০ ডলারের বেশি আয় করেন। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক এলাকায় এই আয় ভালো হিসেবেই বিবেচিত হয়। কিন্তু সিয়াটলের উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়ে সেই আয়েও স্বস্তি নেই।

তিনি ও তার সঙ্গী এক শয়নকক্ষের একটি অ্যাপার্টমেন্টে থাকেন। মাসিক ভাড়া ১ হাজার ৭০০ ডলার। এর বাইরে শুধু ইউটিলিটি বিলই প্রায় ২০০ ডলার

সিয়াটল অঞ্চলের বড় বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান Puget Sound Energy-এর গ্রাহকদের বিদ্যুৎ বিল ২০২৪ সালের পর থেকে প্রায় ৪৮.৫ শতাংশ বেড়েছে।

জ্বালানির দাম আরও বাড়ার পর জনসন দ্বিতীয় চাকরি নেওয়া কিংবা আরেকজন রুমমেট রাখার কথাও ভেবেছেন।

খরচ কমাতে তিনি ও তার সঙ্গী বাইরে খাওয়া বন্ধ করেছেন, ভ্রমণের পরিকল্পনা বাদ দিয়েছেন এবং তাজা ফল-সবজি কেনাও সীমিত করেছেন।

জনসনের ভাষায়, এখন তাদের চিন্তার বড় অংশজুড়েই শুধু টাকা। সামনে এমন কোনো সময় আসবে কি না, যখন স্বস্তিতে বাঁচা যাবে, সেটিও অনিশ্চিত মনে হচ্ছে।

প্রযুক্তি খাতের কর্মীরাও অনিশ্চয়তায়

সিয়াটল বিশ্বের অন্যতম বড় প্রযুক্তি কেন্দ্র। অ্যামাজন ও মাইক্রোসফটের মতো প্রতিষ্ঠানের বহু কর্মী এখানে বসবাস করেন। কিন্তু মূল্যস্ফীতি ও চাকরির অনিশ্চয়তা এখন উচ্চ আয়ের প্রযুক্তি কর্মীদের মধ্যেও প্রভাব ফেলছে।

সিয়াটলে একটি ব্রুয়ারি ও ককটেল বার পরিচালনা করেন ক্রিস এলফোর্ড। তার নিয়মিত ক্রেতাদের অনেকেই বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত।

তিনি জানান, প্রায় ১৩ বছর সিয়াটলে থাকার পর এবারই প্রথম প্রযুক্তি খাতের কর্মীদের মধ্যেও এক ধরনের অনিশ্চয়তা দেখতে পাচ্ছেন। অর্থের অভাব তাদের প্রধান সমস্যা নয়; বরং চাকরি থাকবে কি না, সেটিই বড় উদ্বেগ।

২০২৪ সালে সিয়াটল এলাকায় কম্পিউটার ও গণিতভিত্তিক পেশায় প্রায় ২ লাখ ৫ হাজার মানুষ কাজ করতেন, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১১ হাজার কম।

১৬ ডলারের বার্গার ৮ ডলারে, বাড়ছে ক্রেতা

মানুষ যে এখন ছাড় ও সাশ্রয়ী খাবার খুঁজছেন, সেটিও ব্যবসায়ীরা স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছেন।

এলফোর্ডের ‘Here Today’ ব্রুয়ারিতে সোমবার ৮ ডলারে স্ম্যাশবার্গার বিক্রি হয়, যার স্বাভাবিক দাম ১৬ ডলার। এই অফারের কারণে গত গ্রীষ্মের তুলনায় সোমবারের ক্রেতা প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে।

আরেকটি জনপ্রিয় পণ্য হলো ৪ ডলারের ‘Jell-O shot’। এলফোর্ডের মতে, মানুষ কম খরচে বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ করার সুযোগ খুঁজছে বলেই এ ধরনের সস্তা পণ্যের বিক্রি বাড়ছে।

তবে ব্যবসায়ীদের নিজেদের খরচও বাড়ছে। গত এক বছরে গরুর মাংসের দাম ১১ শতাংশের বেশি বেড়েছে। সাইট্রাস ফলের দাম বাড়ায় তার ককটেল বারে অনেক পানীয়তে তাজা লেবুর পরিবর্তে দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য বিকল্প ব্যবহার করতে হচ্ছে।

মধ্যবিত্তের প্রশ্ন, ‘আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে?’

ওয়াশিংটনের লেক স্টিভেন্সে বসবাসকারী অ্যালিসিয়া রোটেনের পরিবার বাইরে খাওয়া প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে।

জ্বালানি, মুদি পণ্য, ওষুধ ও শিশুখাদ্যের দাম তাদের পরিবারের বাজেটে বড় চাপ তৈরি করেছে।

রোটেনের বড় ছেলে অটিজম ও ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত। গত চার বছরে তার ১৬টি চিকিৎসা প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। নিয়মিত চিকিৎসার জন্য পরিবারটিকে সিয়াটল চিলড্রেনস হাসপাতালে যেতে হয়।

হাসপাতালে যাওয়া-আসায় প্রায় ৭০ মাইল পথ পাড়ি দিতে হয়। পেট্রোলের দাম বাড়ায় এখন সেই যাতায়াতও আগের তুলনায় অনেক বেশি ব্যয়বহুল।

রোটেন বলেন, প্রতিটি বিল আলাদাভাবে ৫ বা ১০ শতাংশ করে বাড়লেও সব মিলিয়ে একসময় খরচ আয়ের সীমা ছাড়িয়ে যায়।

তার বাবা-মা একসময় সিয়াটল এলাকায় প্রায় ৩ লাখ ডলারে ভালো একটি বাড়ি কিনেছিলেন এবং সন্তানদের নানা কার্যক্রমের খরচও চালাতে পেরেছিলেন। কিন্তু এক প্রজন্ম পর রোটেন ও তার স্বামী সেই একই আর্থিক স্বস্তি পাচ্ছেন না।

তাদের কেনা বাড়িটি প্রথমে সাময়িক বাসস্থান হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা থাকলেও অর্থের অভাবে সংস্কারও স্থগিত রাখতে হয়েছে।

রোটেনের প্রশ্ন, এক প্রজন্মের মধ্যেই পরিস্থিতি এতটা বদলে গেল কীভাবে? তারা ধনী নন, গরিবও নন, কিন্তু মাঝখানে থাকা অসংখ্য পরিবারের মতো তারাও এখন বুঝতে পারছেন না অর্থনীতির এই সমীকরণে তাদের অবস্থান কোথায়।

সিয়াটলের বর্তমান বাস্তবতা দেখাচ্ছে, অর্থনীতি সামগ্রিকভাবে সচল থাকলেও উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ সবার ওপর সমানভাবে পড়ছে না। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও কর্মজীবী পরিবারগুলোর জন্য আয় বাড়ার চেয়ে দ্রুত বাড়তে থাকা দৈনন্দিন খরচ এখন সবচেয়ে বড় সংকটে পরিণত হয়েছে।