হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধঝুঁকি, জাহাজ চলাচলে বাড়ছে বীমার খরচ

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা বাড়ায় জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি ও যুদ্ধবীমার খরচ আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে নতুন হামলার পর বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিটি জাহাজের ঝুঁকি নতুন করে মূল্যায়ন করছে।

এই বৈশ্বিক সামুদ্রিক বীমা ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে লয়েডস অব লন্ডন। তিন শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটি সামুদ্রিক বীমার সঙ্গে যুক্ত। লন্ডনের আধুনিক ভবনের ভেতরে এখনো সংরক্ষিত রয়েছে শত শত ‘Loss Book’, যেখানে গত প্রায় ২৫০ বছরে সমুদ্রে হারিয়ে যাওয়া জাহাজের তথ্য হাতে লেখা হয়েছে।

এমনকি ১৯১২ সালের এপ্রিলে ডুবে যাওয়া বিখ্যাত টাইটানিকের তথ্যও এসব নথিতে রয়েছে। শত বছরের বেশি সময় পার হলেও এখনো লয়েডসের কর্মীরা ঐতিহ্য ধরে রেখে পালকের কলম ও কালি দিয়ে এসব রেকর্ড লিখে থাকেন।

টাইটানিকের বীমা ছিল ১০ লাখ পাউন্ড

বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত জাহাজগুলোর একটি টাইটানিকও লয়েডস অব লন্ডনের মাধ্যমে বীমা করা হয়েছিল। সে সময় এর বীমামূল্য ছিল ১০ লাখ পাউন্ড। বর্তমান মূল্যে যার পরিমাণ প্রায় ১০ কোটি ১৬ লাখ পাউন্ড

সামুদ্রিক বীমার ক্ষেত্রে দীর্ঘ ইতিহাস ও বৈশ্বিক প্রভাবের কারণে লয়েডসকে অনেকেই আন্তর্জাতিক বীমা শিল্পের অনানুষ্ঠানিক সদরদপ্তর হিসেবে বিবেচনা করেন।

আর এ কারণেই হরমুজ প্রণালিতে সংঘাত শুরু হলে এর প্রভাব দ্রুত লন্ডনের বীমাবাজারে গিয়ে পড়ে।

অবরোধের পর রাতারাতি বেড়ে যায় ঝুঁকি

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে তেহরান হরমুজ প্রণালি অবরোধ করলে সেখানে চলাচলকারী জাহাজের ঝুঁকি রাতারাতি অনেক বেড়ে যায়।

ফলে বীমা কোম্পানিগুলোও দ্রুত ব্যবস্থা নেয়। প্রচলিত যুদ্ধবীমার অনেক পলিসি বাতিল করে নতুন ও অনেক বেশি প্রিমিয়ামে তা পুনরায় চালু করা হয়।

কারণ যুদ্ধক্ষেত্র বা সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের মধ্য দিয়ে জাহাজ চলাচল করলে ক্ষয়ক্ষতি, হামলা কিংবা জাহাজ আটকে পড়ার আশঙ্কা বহুগুণ বেড়ে যায়। সেই অতিরিক্ত ঝুঁকির মূল্য শেষ পর্যন্ত বীমা প্রিমিয়ামেও যুক্ত হয়।

নতুন হামলায় ফের বদলেছে ঝুঁকির হিসাব

সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে নতুন করে হামলার ঘটনায় হরমুজ প্রণালির ঝুঁকি আবারও আলোচনায় এসেছে।

লন্ডনভিত্তিক ব্রোকার প্রতিষ্ঠান McGill and Partners-এর সামুদ্রিক বিভাগের প্রধান ডেভিড স্মিথ জানিয়েছেন, বীমা আন্ডাররাইটাররা এখন আবারও দাম ও প্রতিটি জাহাজের ‘ব্যক্তিগত ঝুঁকির বিষয়’ খুঁটিয়ে পরীক্ষা করছেন।

তার মতে, কিছুদিন তুলনামূলক স্থিতিশীলতা এবং হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল বাড়ার পর সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো আবারও পুরো ঝুঁকির পরিস্থিতি বদলে দিয়েছে।

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি

হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজের নিরাপত্তা শুধু বীমা কোম্পানি বা নৌপরিবহন প্রতিষ্ঠানের বিষয় নয়। এই পথে কোনো বড় ধরনের সংকট তৈরি হলে তার প্রভাব আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি পরিবহন ও পরিবহন ব্যয়ের ওপরও পড়তে পারে।

ঝুঁকি বাড়লে জাহাজমালিকদের বেশি বীমা প্রিমিয়াম দিতে হয়। এর সঙ্গে নিরাপত্তা ও পরিচালন ব্যয়ও বেড়ে যেতে পারে। ফলে সামুদ্রিক পরিবহনের সামগ্রিক খরচ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালির বর্তমান উত্তেজনা দেখাচ্ছে যুদ্ধের ঝুঁকিও একটি বাজারমূল্য বহন করে। আর সেই ঝুঁকির দাম নির্ধারিত হচ্ছে লন্ডনের বীমাবাজারে, যেখানে শত শত বছরের পুরোনো ঐতিহ্যের পাশাপাশি আধুনিক ভূরাজনীতির হিসাবও প্রতিদিন নতুন করে লেখা হচ্ছে।