বাড়ি ও গাড়ির ঋণের কিস্তি দিতে হিমশিম খাচ্ছেন আরও বেশি মার্কিনি

যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ি ও গাড়ির ঋণের কিস্তি সময়মতো পরিশোধ করতে না পারা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের নতুন তথ্য বলছে, গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মার্কিনি এখন মর্টগেজ ও গাড়ির ঋণের কিস্তিতে পিছিয়ে পড়েছেন।

নিউইয়র্ক ফেডের সর্বশেষ Quarterly Report on Household Debt and Credit অনুযায়ী, চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে বাড়ির ঋণের কিস্তি অন্তত ৩০ দিন বকেয়া থাকা মানুষের হার ২০১৫ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

একই সময়ে গাড়ির ঋণে গুরুতর বকেয়া, অর্থাৎ ৯০ দিন বা তার বেশি সময় ধরে কিস্তি না দেওয়ার হার ২০১০ সালের পর যেকোনো প্রান্তিকের তুলনায় সর্বোচ্চ হয়েছে।

তবে প্রতিবেদনে এটাও স্পষ্ট করা হয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের সব পরিবার একই ধরনের আর্থিক চাপে নেই। অধিকাংশ ঋণগ্রহীতা এখনো তাদের ঋণ সামাল দিতে পারছেন এবং সামগ্রিক বকেয়ার হার এখনো ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের সময়কার ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

একই অর্থনীতিতে দুই ধরনের বাস্তবতা

নিউইয়র্ক ফেডের গবেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত ‘K-shaped economy’ বা অসম অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের চিত্রই তুলে ধরছে।

একদিকে উচ্চ আয়ের বহু মানুষ স্থিতিশীল চাকরি, শেয়ারবাজারের উত্থান এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বিপুল বিনিয়োগ থেকে সুবিধা পাচ্ছেন। অন্যদিকে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের বহু পরিবার উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং দুর্বল চাকরির বাজারের কারণে ক্রমেই চাপের মুখে পড়ছেন।

ভোক্তা অর্থনীতি বিশ্লেষক ম্যাট শুলজের মতে, অনেক মানুষ ভালো অবস্থায় আছেন এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে খরচ করছেন। কিন্তু একই সময়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ উচ্চ পণ্যমূল্য ও অনিশ্চিত চাকরির বাজার নিয়ে উদ্বিগ্ন।

গাড়ির ঋণে বকেয়া বাড়া উদ্বেগের সংকেত

বিশেষজ্ঞদের কাছে গাড়ির ঋণে বকেয়া বাড়ার বিষয়টি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের অনেক মানুষের দৈনন্দিন জীবনে গাড়ি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কর্মস্থলে যাওয়া থেকে শুরু করে পরিবারের দৈনন্দিন প্রয়োজন পূরণ পর্যন্ত গাড়ির ওপর নির্ভর করতে হয়।

শুলজ বলেন, সাধারণত একজন মানুষ চরম আর্থিক চাপে না পড়া পর্যন্ত গাড়ির ঋণের কিস্তি বন্ধ করেন না। ফলে গাড়ির ঋণে বকেয়া বাড়া পরিবারগুলোর আর্থিক সংকট গভীর হওয়ার ইঙ্গিত দিতে পারে।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় গাড়ি ব্যবহারকারীদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।

মূল্যস্ফীতিতে কমছে ক্রয়ক্ষমতা

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি সামগ্রিকভাবে প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে এবং বেকারত্বও তুলনামূলক কম। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বিপুল আগ্রহ ও বিনিয়োগ শেয়ারবাজার এবং অনেক মার্কিন নাগরিকের সম্পদ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে।

কিন্তু এই প্রবৃদ্ধির আড়ালে অর্থনৈতিক বৈষম্যও বাড়ছে।

পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি মূল্যস্ফীতি মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। বিশেষ করে যাদের আয় সীমিত, তাদের ওপর এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে।

অনেক খাতে চাকরি বৃদ্ধির গতিও মন্থর। পাশাপাশি জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতি শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির সুফল অনেকটাই কেড়ে নিচ্ছে।

গবেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে এমন অনেক পরিবার রয়েছে যারা মাসের বেতন দিয়েই মাসের খরচ চালায়। তাদের জীবনে হঠাৎ একটি বড় ব্যয় বা আর্থিক ধাক্কাই ঋণের কিস্তি বকেয়া হওয়ার জন্য যথেষ্ট।

মার্কিন পরিবারের ঋণ ১৮.৮ ট্রিলিয়ন ডলার

দ্বিতীয় প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের মোট পারিবারিক ঋণের পরিমাণ ১৩ বিলিয়ন ডলার বা শূন্য দশমিক ১ শতাংশ কমে ১৮.৮ ট্রিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

তবে নিউইয়র্ক ফেড জানিয়েছে, এই পতনকে প্রকৃত ঋণ কমার চিত্র হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। মর্টগেজ ঋণ এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরের সময় ক্রেডিট রিপোর্টে তথ্য আসতে দেরি হওয়ায় সাময়িকভাবে ঋণের পরিমাণ কম দেখানো হয়েছে।

এই প্রযুক্তিগত বিষয়টি বাদ দিলে মোট পারিবারিক ঋণ বরং প্রায় ৬১ বিলিয়ন ডলার বা শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ বাড়ত।

মর্টগেজ ছাড়া হোম ইকুইটি ঋণ, শিক্ষাঋণ, গাড়ির ঋণ, ক্রেডিট কার্ড এবং ব্যক্তিগত ঋণসহ প্রায় সব বড় ঋণ খাতেই বকেয়ার পরিমাণ বেড়েছে।

নতুন গাড়ি ঋণে রেকর্ড

দ্বিতীয় প্রান্তিকে মার্কিন নাগরিকদের ক্রেডিট রিপোর্টে রেকর্ড ২১১ বিলিয়ন ডলারের নতুন গাড়ি ঋণ যুক্ত হয়েছে।

সাধারণত কর ফেরতের মৌসুমে যুক্তরাষ্ট্রে গাড়ি কেনার প্রবণতা বাড়ে। তবে এবার গাড়ির দাম আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি হওয়ায় নতুন গাড়ি কিনতে মানুষকে আরও বড় অঙ্কের ঋণ নিতে হচ্ছে।

সব মিলিয়ে তথ্যগুলো বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখলেও সেই সুফল সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না। একদল মানুষ অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছন্দ থাকলেও বাড়ি, গাড়ি ও দৈনন্দিন ব্যয় সামলাতে ক্রমেই হিমশিম খাচ্ছেন বহু মার্কিনি।