আমেরিকার ভিসা পেতে কত টাকা লাগে? আবেদন থেকে ভিসা পাওয়া পর্যন্ত কত খরচ

ঢাকা: যুক্তরাষ্ট্রে ঘুরতে যাওয়া, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করা কিংবা ব্যবসায়িক কাজে যেতে আগ্রহী বাংলাদেশিদের কাছে আমেরিকার ভিসার খরচ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে যারা প্রথমবার যুক্তরাষ্ট্রের ভিসার জন্য আবেদন করতে যাচ্ছেন, তাদের অনেকেরই প্রশ্ন—আমেরিকার ভিসা পেতে কত টাকা লাগে? শুধু ভিসার ফি কত, তা নয়; আবেদন করতে মোট কত খরচ হতে পারে এবং ব্যাংকে কত টাকা থাকা প্রয়োজন—এসব নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন।

যুক্তরাষ্ট্রের ভিসার খরচ মূলত নির্ভর করে ভিসার ধরন ও আবেদনকারীর পরিস্থিতির ওপর। বাংলাদেশ থেকে পর্যটন বা ব্যবসার উদ্দেশ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত B1/B2 ভিসার ক্ষেত্রে বর্তমানে সরকারি আবেদন ফি ১৮৫ মার্কিন ডলার। এই ফি ভিসা আবেদন প্রক্রিয়ার জন্য নেওয়া হয় এবং আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলেও সাধারণত ফেরত দেওয়া হয় না। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রকাশিত বর্তমান ফি তালিকাতেও B শ্রেণির visitor visa-এর আবেদন ফি ১৮৫ ডলার উল্লেখ করা হয়েছে।

বর্তমান ডলার রেটের ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশি টাকায় এই ১৮৫ ডলারের মূল্য কম-বেশি হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে প্রতি ডলার ১২২ টাকা ধরে হিসাব করলে ১৮৫ ডলারের মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ২২ হাজার ৫৭০ টাকা। তবে ভিসা ফি পরিশোধের সময় প্রযোজ্য বিনিময় হার ও পেমেন্ট ব্যবস্থার কারণে প্রকৃত টাকার অঙ্ক কিছুটা ভিন্ন হতে পারে।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার—১৮৫ ডলার ভিসা কেনার টাকা নয়। এটি মূলত ভিসা আবেদনের processing fee। অর্থাৎ এই টাকা পরিশোধ করার পর আপনার আবেদন পরীক্ষা করা হবে; টাকা দিলেই ভিসা নিশ্চিত হয়ে যাবে, এমন কোনো নিয়ম নেই।

বাংলাদেশি নাগরিকদের ক্ষেত্রে B1, B2 এবং B1/B2 ভিসার জন্য বর্তমানে U.S. Department of State-এর Bangladesh Reciprocity Schedule-এ আলাদা কোনো reciprocity বা visa issuance fee দেখানো হয়নি। অর্থাৎ B1/B2 আবেদনকারীর ক্ষেত্রে সরকারি মূল application fee হিসেবে ১৮৫ ডলারই প্রযোজ্য।

তবে একজন আবেদনকারীর প্রকৃত খরচ শুধু ভিসা ফিতে শেষ হয় না। পাসপোর্ট, ছবি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি, ঢাকায় যাতায়াতসহ বিভিন্ন আনুষঙ্গিক খরচ থাকতে পারে। কেউ যদি ভিসা সংক্রান্ত পরামর্শ বা document preparation-এর জন্য কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সাহায্য নেন, সেই service charge-ও আলাদা। এসব অর্থ যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ভিসা ফি নয়।

আমেরিকার টুরিস্ট ভিসা করতে কত টাকা লাগে

যুক্তরাষ্ট্রে বেড়াতে যাওয়ার জন্য সাধারণত B2 বা B1/B2 visitor visa ব্যবহৃত হয়। পর্যটন, ছুটি কাটানো, আত্মীয় বা বন্ধুর সঙ্গে দেখা করা এবং নির্দিষ্ট কিছু medical treatment-এর মতো উদ্দেশ্যে visitor visa ব্যবহার করা যায়। এর সরকারি application fee বর্তমানে ১৮৫ ডলার।

তবে ভিসার আবেদন করার সময় বিমান টিকিট কিনে ফেলতেই হবে—এমন নয়। বরং ভ্রমণের পরিকল্পনা থাকলেও ভিসা অনুমোদনের আগে non-refundable বড় খরচ করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা ভালো। ভিসা পাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার জন্য বিমান ভাড়া, থাকার জায়গা, খাবার, স্থানীয় যাতায়াত এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত ব্যয় আলাদাভাবে যোগ হবে।

আমেরিকার ভিসার জন্য ব্যাংকে কত টাকা থাকতে হয়

আমেরিকার ভিসা নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত ভুল ধারণাগুলোর একটি হলো, ব্যাংকে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা থাকলেই ভিসা পাওয়া যায়। বাস্তবে এমন কোনো সাধারণ নিয়ম নেই যে প্রত্যেক B1/B2 আবেদনকারীর ব্যাংকে ১০ লাখ, ২০ লাখ বা ৫০ লাখ টাকা থাকতেই হবে।

একজন আবেদনকারীর আর্থিক সক্ষমতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ ভ্রমণের খরচ কীভাবে বহন করবেন, আপনার আয় কোথা থেকে আসে এবং আপনার আর্থিক অবস্থার সঙ্গে ভ্রমণ পরিকল্পনার সামঞ্জস্য আছে কি না—এসব বিষয় সামগ্রিকভাবে বিবেচনায় আসতে পারে।

তাই শুধু হঠাৎ করে ব্যাংকে বড় অঙ্কের টাকা জমা রেখে সেটিকে ভিসা পাওয়ার নিশ্চয়তা হিসেবে দেখা ঠিক নয়। নিজের প্রকৃত আয়, চাকরি বা ব্যবসা এবং স্বাভাবিক আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্য উপস্থাপন করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আমেরিকার ভিসা পেতে কি এজেন্টকে টাকা দিতে হয়

না। যুক্তরাষ্ট্রের ভিসার জন্য আবেদন করতে কোনো নির্দিষ্ট এজেন্ট নিয়োগ করা বাধ্যতামূলক নয়। আবেদনকারী নিজে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারেন। কেউ চাইলে বেসরকারি consultancy বা document preparation service নিতে পারেন, কিন্তু তাদের নেওয়া অর্থ সরকারি ভিসা ফি নয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি টাকা নিয়ে “১০০ শতাংশ ভিসা নিশ্চিত”, “ভিসা গ্যারান্টি” বা “ইন্টারভিউ ছাড়াই ভিসা” দেওয়ার দাবি করে, তাহলে সতর্ক হওয়া উচিত। ভিসার সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট মার্কিন কর্তৃপক্ষের প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে।

Student Visa-এর খরচ কত

শুধু পর্যটক নয়, বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর অনেক শিক্ষার্থী যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার জন্য আবেদন করেন। F এবং M ধরনের student visa-এর application fee বর্তমানে ১৮৫ ডলার

তবে শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ১৮৫ ডলার পুরো আমেরিকা যাওয়ার খরচ নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের tuition fee, থাকার খরচ, খাবার, স্বাস্থ্যবীমা, বই, যাতায়াতসহ অনেক বড় ব্যয় রয়েছে। তাই student visa-এর ক্ষেত্রে ভিসা ফি এবং আমেরিকায় পড়াশোনার মোট বাজেটকে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।

Work Visa-এর ক্ষেত্রে কত টাকা লাগে

চাকরির জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যেতে চাইলে ভিসার ধরন অনুযায়ী খরচ পরিবর্তিত হয়। H, L, O, P, Q ও R-এর মতো petition-based কিছু nonimmigrant visa-এর application processing fee বর্তমানে ২০৫ ডলার

তবে work visa-এর ক্ষেত্রে শুধু আবেদনকারীর ভিসা ফি দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। সংশ্লিষ্ট petition, employer এবং immigration process-এর ওপর ভিত্তি করে অতিরিক্ত সরকারি ফি থাকতে পারে। কোন খরচ employer বহন করবে আর কোনটি আবেদনকারীর ওপর পড়বে, সেটিও পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে।

দ্রুত আমেরিকার ভিসা করতে বাড়তি টাকা লাগে কি

২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর কিছু নির্দিষ্ট দূতাবাস ও কনস্যুলেটে একটি expedited appointment pilot program চালু করেছে। এর আওতায় যোগ্য B visa আবেদনকারীরা নির্দিষ্ট শর্ত ও availability সাপেক্ষে দ্রুত সাক্ষাৎকারের জন্য অতিরিক্ত ৭৫০ ডলার দিতে পারেন। তবে এটি সাধারণ B1/B2 আবেদনের বাধ্যতামূলক ফি নয় এবং সব জায়গায় প্রযোজ্যও নয়। প্রথমে স্বাভাবিক ১৮৫ ডলারের MRV fee দিয়ে নিয়মিত appointment process অনুসরণ করতে হয়।

তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ যদি বলেন, “আমেরিকার টুরিস্ট ভিসার নতুন ফি ৯৩৫ ডলার”—তাহলে সেটিকে সাধারণ আবেদনকারীর নিয়মিত ভিসা ফি হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।

ভিসার টাকা দিলেই কি আমেরিকা যাওয়া যায়

ভিসা পাওয়ার পরও যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের বিষয়টি আলাদা। Visitor visa মূলত যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণের জন্য অনুমতি চাওয়ার একটি মাধ্যম। সীমান্তে প্রবেশের সময় শেষ সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট U.S. Customs and Border Protection কর্মকর্তার। তাই ভিসা হাতে পাওয়া মানেই কোনো ব্যক্তির যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ শতভাগ নিশ্চিত—এমন ধারণাও সঠিক নয়।

সব মিলিয়ে কত টাকা প্রস্তুত রাখতে হবে

যদি কেউ বাংলাদেশ থেকে শুধু B1/B2 visitor visa-এর জন্য আবেদন করতে চান, তাহলে প্রথমেই সরকারি ১৮৫ ডলার application fee-এর কথা মাথায় রাখতে হবে। বাংলাদেশি টাকায় এর মূল্য ডলারের বিনিময় হারের ওপর নির্ভর করবে।

এর সঙ্গে ছবি, যাতায়াত, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত খরচ যোগ হতে পারে। কিন্তু এগুলো মিলিয়ে একটি নির্দিষ্ট “আমেরিকার ভিসার দাম” বলা ঠিক হবে না।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভিসা পেতে নির্দিষ্ট কোনো অঙ্কের টাকা দিতে হয় না এবং ব্যাংকে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা থাকলেই ভিসা নিশ্চিত হয় না। আবেদনকারীর উদ্দেশ্য, যোগ্যতা, আর্থিক সক্ষমতা এবং পুরো পরিস্থিতি বিবেচনা করেই আবেদন মূল্যায়ন করা হয়।

তাই আমেরিকার ভিসার জন্য আবেদন করার আগে সরকারি ওয়েবসাইটের সর্বশেষ তথ্য দেখে ফি পরিশোধ করা এবং নিজের তথ্য সঠিকভাবে উপস্থাপন করাই সবচেয়ে নিরাপদ পথ। ভিসার নিয়ম ও ফি পরিবর্তিত হতে পারে, তাই আবেদন করার সময় সর্বশেষ সরকারি নির্দেশনাই চূড়ান্ত হিসেবে ধরা উচিত।