তাইওয়ান ঘিরে চীনের দাবির প্রতি ইন্দোনেশিয়ার সমর্থন: অনিচ্ছাকৃত নাকি কৌশলগত?

প্রকাশ:

গত ১২ আগস্ট সকালে তাইওয়ানের পূর্ববর্তী জলসীমায় চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি নেভি (PLAN) এবং ইন্দোনেশীয় নৌবাহিনীর একটি যুদ্ধজাহাজ যৌথ মহড়া পরিচালনা করে। ভূ-রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল এই এলাকায় কোনো বিদেশি সামরিক বাহিনীর সাথে চীনের এটিই ছিল প্রথম যৌথ মহড়া। এই ঘটনাটি তাইওয়ানের কর্তৃপক্ষের তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। তাইওয়ান একে রাজনৈতিক কারসাজি হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেছে, এর উদ্দেশ্য হলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে এমন একটি ভুল ধারণা তৈরি করা যে, তাইওয়ানের পূর্বের জলসীমার ওপর চীনা কমিউনিস্ট পার্টির এখতিয়ার রয়েছে। একইসাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চীনকে তাইওয়ানের ওপর ক্রমাগত সামরিক চাপ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে।

চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম অবশ্য এই মহড়াকে ওই অঞ্চলের ওপর বেইজিংয়ের সার্বভৌমত্বের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছে। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র গ্লোবাল টাইমস-এর সাথে আলাপকালে সামরিক বিশেষজ্ঞ ঝাং জুনশে এই মহড়াকে ‘অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ’ বলে বর্ণনা করেন। তার মতে, এটি কেবল প্রথম কোনো যৌথ মহড়াই নয়, বরং এটি তাইওয়ান দ্বীপের পূর্ব দিকে অবস্থিত এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোনের (EEZ) ওপর চীনের সার্বভৌম অধিকার ও এখতিয়ারের বহিঃপ্রকাশ।

বেইজিং বর্তমানে তাইওয়ানের পূর্ব উপকূলে নিজেদের উপস্থিতি বাড়ানোর চেষ্টা করছে। জুন মাসের শুরুর দিকে জাপান ও ফিলিপাইন তাদের এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন নিয়ে সীমানা নির্ধারণের আলোচনা শুরু করলে চীন সেখানে কোস্ট গার্ড ও আইন প্রয়োগকারী জাহাজ পাঠায়। যদিও পিপলস লিবারেশন আর্মি নেভি নিয়মিত সেখানে মহড়া চালায়, তবে এবারই প্রথম কোস্ট গার্ড স্বাধীনভাবে ওই অঞ্চলে টহল দিয়েছে। এই উপস্থিতি এখন অনেকটা স্থায়ী রূপ নিয়েছে এবং চীন এখন তৃতীয় কোনো দেশকে ব্যবহার করে নিজেদের এখতিয়ারকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছে।

অন্যদিকে, ইন্দোনেশিয়ার নৌবাহিনী এই মহড়ার গুরুত্বকে খাটো করে দেখার চেষ্টা করেছে। ইন্দোনেশীয় গণমাধ্যমের তথ্যমতে, ভ্লাদিভোস্তকে রাশিয়ার সাথে যৌথ মহড়া শেষে ফেরার পথে চীনের নৌবাহিনীর সাথে ‘সীমিত যৌথ প্রশিক্ষণ বা পাসিং এক্সারসাইজ’ সম্পন্ন করেছে তারা। ইন্দোনেশিয়ার দাবি, তাদের জাহাজটি এর আগেও জাপান ও মার্কিন সপ্তম নৌবহরের সাথে একই ধরনের মহড়া করেছে। তাদের প্রেস বিবৃতিতে ‘এখতিয়ার’ সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গিয়ে ইন্দোনেশিয়ার ‘মুক্ত ও সক্রিয়’ পররাষ্ট্রনীতি এবং অন্য দেশের জলসীমা অতিক্রমের সময় প্রচলিত নৌ-ঐতিহ্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

ইন্দোনেশিয়া এই মহড়ার সংবেদনশীলতা সম্পর্কে আগে থেকে অবগত ছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়। বেইজিং যেখানে একে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে প্রচার করছে, সেখানে জাকার্তা একে কেবল একটি রুটিন মহড়া হিসেবেই দেখছে। এই ঘটনাটি এমন এক প্রবণতার অংশ যেখানে চীন বিভিন্ন দেশকে তাদের ‘ওয়ান চায়না’ নীতির কঠোর ব্যাখ্যার সমর্থনে কাজে লাগাচ্ছে। ২০১৬ সালে ডেমোক্রেটিক প্রগ্রেসিভ পার্টি (DPP) ক্ষমতায় আসার পর থেকে তাইওয়ানের কূটনৈতিক মিত্রের সংখ্যা ২৩ থেকে কমে ১২টিতে নেমে এসেছে। তবে এসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তাইওয়ান বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাথে অনানুষ্ঠানিক সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে।

চলতি বছরের এপ্রিল মাসে সেশেলস, মরিশাস ও মাদাগাস্কার তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে-র এসওয়াতিনি সফরের সময় আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি বাতিল করে। এটি ছিল তৃতীয় কোনো দেশের সরাসরি হস্তক্ষেপের প্রথম উদাহরণ। যদিও তাইওয়ান একে চীনের অর্থনৈতিক জবরদস্তির ফল বলে মনে করে, তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই দেশগুলো বেইজিংয়ের সুনজরে আসার সুযোগ হিসেবেই এমনটি করেছে। শেষ পর্যন্ত এসওয়াতিনি সরকারের বিমানে করে প্রেসিডেন্ট লাই সেখানে পৌঁছাতে সক্ষম হন।

আফ্রিকা ও ওশেনিয়ার অন্যান্য দেশও তাইওয়ানের বিষয়ে তাদের নীতি কঠোর করেছে। জুন মাসে কেনিয়া তাইওয়ানের দুই শিক্ষাবিদের পাসপোর্ট জব্দ করে। মে মাসে জাম্বিয়া ‘রাইটসকন ২০২৬’ সম্মেলন বাতিল করে, যার পেছনে চীনা চাপের অভিযোগ রয়েছে। জুলাই মাসে মরক্কো তাইওয়ানিজ পাসপোর্টধারীদের ভিসা নিশ্চিতকরণ পত্র দেওয়া বন্ধ করে দেয়। একই সপ্তাহে উগান্ডা তাইওয়ানিজ ভ্রমণকারীদের পাসপোর্ট আটকে রেখে চীনা পাসপোর্ট দাবি করে, যার ফলে তাইওয়ানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উগান্ডার জন্য ভ্রমণ সতর্কতা জারি করে। জুলাই মাসে পাপুয়া নিউ গিনিও তাইওয়ানের প্রতিনিধি কার্যালয় বন্ধের ঘোষণা দেয়, যা বেইজিংয়ের ‘ওয়ান চায়না’ নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এসব ঘটনা তাইওয়ানের ওপর চীনের ক্রমবর্ধমান ‘গ্রে-জোন’ চাপের একটি অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

শেয়ার করুন