ট্রাম্পের পারিবারিক ক্রিপ্টো ব্যবসায় ব্যাংক স্ট্যাটাস: নজিরবিহীন সিদ্ধান্তের সমালোচনায় সরব আইনপ্রণেতারা

প্রকাশ:

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ব্যাংক নিয়ন্ত্রক সংস্থা ট্রাম্প পরিবারের মালিকানাধীন ক্রিপ্টো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে ব্যাংক চার্টার বা ব্যাংক হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনার শর্তসাপেক্ষ অনুমোদন দিয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে প্রতিষ্ঠানটি এখন বড় গ্রাহকদের সেবা দেওয়ার সুযোগ পাবে এবং তাদের মুনাফা বৃদ্ধির পথ প্রশস্ত হবে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম ঘটনা, যেখানে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের পরিবারের মালিকানাধীন কোনো কোম্পানি ব্যাংক স্ট্যাটাস পেল। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ডেমোক্রেটিক আইনপ্রণেতারা স্বার্থের সংঘাত নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

শুক্রবার প্রকাশিত এক চিঠিতে ‘অফিস অফ দ্য কম্পট্রোলার অফ দ্য কারেন্সি’ (OCC) জানিয়েছে, তারা ‘ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ট্রাস্ট কোং’-কে মার্কিন ডলারের সাথে যুক্ত স্টেবলকয়েন ক্রিপ্টোকারেন্সি ইস্যু করার অনুমতি দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইট অনুযায়ী, এর ৩৮ শতাংশ মালিকানা ডোনাল্ড জে. ট্রাম্প এবং তার পরিবারের সদস্যদের সাথে সংশ্লিষ্ট একটি সত্তার হাতে রয়েছে।

এর আগে ‘ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফিন্যান্সিয়াল’ তাদের স্টেবল ডিজিটাল কারেন্সি সরবরাহের জন্য বিটগো (BitGo)-এর মতো তৃতীয় পক্ষের ক্রিপ্টো কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল ছিল। নতুন এই অনুমোদনের ফলে ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটি মধ্যস্থতাকারী ছাড়াই সরাসরি এই সেবা প্রদান করতে পারবে। সাধারণত বিটকয়েনের মতো ডিজিটাল মুদ্রাগুলো অস্থির প্রকৃতির হওয়ায় বড় লেনদেনের ক্ষেত্রে এগুলো কম গ্রহণযোগ্য হয়। তবে মার্কিন ডলার বা স্বর্ণের মূল্যের সাথে যুক্ত স্টেবলকয়েনগুলো পেমেন্ট, অর্থ স্থানান্তর বা সঞ্চয়ের মাধ্যম হিসেবে বড় বিনিয়োগকারীদের কাছে বেশি আকর্ষণীয়।

এই অনুমোদনের ফলে ট্রাম্প-সংশ্লিষ্ট ব্যবসাটি এখন ব্যাংক হিসেবে কাজ করতে পারবে এবং গ্রাহকদের লেনদেনের জন্য ডিজিটাল মুদ্রা ইস্যু করবে। গ্রাহকরা মার্কিন ডলারের বিনিময়ে এই স্টেবলকয়েন সংগ্রহ করতে পারবেন, যার মুনাফা সরাসরি ট্রাম্প পরিবারের ক্রিপ্টো ব্যবসায় যুক্ত হবে। ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফিন্যান্সিয়াল বাজারে আসার কয়েকদিনের মধ্যেই প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারের মূলধন সংগ্রহ করেছিল। এছাড়া ট্রাম্পের আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, তার পরিবারের ক্রিপ্টো উদ্যোগ থেকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে ১.৪ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ব্যবসায়িক আয় করেছেন।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি দাবি করেছেন যে, প্রেসিডেন্ট সবসময় আমেরিকান জনগণের স্বার্থে কাজ করেন এবং এখানে কোনো স্বার্থের সংঘাত নেই। তার ভাষ্যমতে, প্রেসিডেন্টের সম্পদ তার সন্তানদের দ্বারা পরিচালিত একটি ব্লাইন্ড ট্রাস্টে রাখা হয়েছে। তবে সাধারণত ব্লাইন্ড ট্রাস্ট একজন স্বাধীন ট্রাস্টির মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ার কথা। কেলি পুনর্ব্যক্ত করেন, প্রেসিডেন্টের সম্পদ তার সন্তানদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় কোনো স্বার্থের সংঘাতের সুযোগ নেই।

২০২৫ সালের মে মাসে আবুধাবির বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান এমজিএক্স (MGX) এই কোম্পানিতে ২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে। তারা ট্রাম্প পরিবারের ইউএসডি১ (USD1) স্টেবলকয়েনটি বাইন্যান্সের (Binance) মতো বড় ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জে ব্যবহারের প্রতিশ্রুতি দেয়। এই চুক্তিটি তখন ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়, কারণ একই সময়ে ট্রাম্প প্রশাসন সংযুক্ত আরব আমিরাতকে অত্যাধুনিক এআই চিপ সরবরাহে সম্মত হয়েছিল, যা নিয়ে আগে থেকেই চীনের কাছে প্রযুক্তি চলে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল।

দুবাইয়ে একটি ক্রিপ্টো সম্মেলনে প্রেসিডেন্টের ছেলে এরিক ট্রাম্পের সাথে এই চুক্তির ঘোষণা দেন ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফিন্যান্সিয়ালের সহ-প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক উইটকফ। উল্লেখ্য, জ্যাক উইটকফ মধ্যপ্রাচ্যে প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের ছেলে।

সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন এই অনুমোদনের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। তিনি জানুয়ারিতেই ওসিসি-কে ট্রাম্প-সংশ্লিষ্ট ব্যবসার অনুমোদন না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। ওয়ারেন বলেন, ‘ইতিহাসে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট তার নিজের আর্থিক কোম্পানি তদারকির দায়িত্বে থাকছেন।’ ওসিসি-র প্রাথমিক অনুমোদনের পর তিনি একে ‘আমাদের আর্থিক ব্যবস্থায় দেখা সবচেয়ে নির্লজ্জ স্বার্থের সংঘাত’ হিসেবে অভিহিত করেন এবং এই দুর্নীতি বন্ধে বিল আনার ঘোষণা দেন।

জবাবে ওসিসি জানিয়েছে, তাদের কর্মকর্তা ও কর্মীরা আইনি দায়িত্ব ও নৈতিক বাধ্যবাধকতা মেনেই এই আবেদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সংস্থাটির দাবি, তাদের প্রতিষ্ঠিত নীতিমালা ও পদ্ধতি অনুযায়ীই আবেদনটি পর্যালোচনা করা হয়েছে। তবে ওসিসি আরও জানিয়েছে, কোম্পানির মূলধন বৃদ্ধি করাসহ বেশ কিছু শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এই চার্টার পুরোপুরি কার্যকর হবে না।

শেয়ার করুন