বিশ্ব পর্যটনশিল্পের জন্য ২০২৬ সাল খুব একটা স্বস্তির নয়। যুদ্ধ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জলবায়ু উদ্বেগ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমান্ত ব্যবস্থায় নতুন জটিলতা মিলিয়ে ইউরোপজুড়ে অনেক পর্যটকের ভ্রমণ পরিকল্পনায় পড়েছে ভাটা। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে যুক্তরাজ্যে পর্যটক কমলেও ব্যতিক্রমী চিত্র দেখা যাচ্ছে স্কটল্যান্ডে।
ভিজিটব্রিটেনের তথ্য অনুযায়ী, জুন ও জুলাইয়ে স্কটল্যান্ডের বিমানবন্দরগুলোতে ফ্লাইট বুকিং বেড়েছে প্রায় ১৫ শতাংশ। একই সময়ে লন্ডন ও ইংল্যান্ডের অন্যান্য অঞ্চলে বুকিং কমেছে। ফলে যুক্তরাজ্যের পর্যটন খাতে স্কটল্যান্ড এখন আলাদা করে নজর কাড়ছে।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে তুলনামূলক শীতল আবহাওয়া স্কটল্যান্ডের প্রতি পর্যটকদের আগ্রহ বাড়িয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে পর্যটন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু আবহাওয়াই নয়, স্কটিশ সংস্কৃতি, হাইল্যান্ডের ঐতিহ্য, কিল্ট পরা ফুটবল সমর্থক ‘টারটান আর্মি’ এবং চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনে স্কটল্যান্ডের জনপ্রিয় উপস্থিতিও বড় ভূমিকা রাখছে।
গত কয়েক বছর ধরে উত্তর আমেরিকা থেকে সরাসরি ফ্লাইট বাড়ানোর যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল, তার সুফল এখন দৃশ্যমান। শুধু যুক্তরাষ্ট্র থেকেই বছরে প্রায় এক লাখ অতিরিক্ত বিমান আসন যুক্ত হয়েছে। ফলে ঐতিহ্যগতভাবে শক্তিশালী মার্কিন পর্যটক বাজার আরও বিস্তৃত হয়েছে।
একই সঙ্গে ইউরোপের মূল ভূখণ্ড থেকেও স্কটল্যান্ডে পর্যটক বেড়েছে। দক্ষিণ ইউরোপের অতিরিক্ত গরম থেকে বাঁচতে অনেকেই উত্তরের শীতল গন্তব্য বেছে নিচ্ছেন। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন এন্ট্রি-এক্সিট ব্যবস্থার কারণে সীমান্তে সম্ভাব্য বিলম্ব ও জটিলতা এড়াতে অনেক ব্রিটিশ নাগরিকও দেশের ভেতরেই ছুটি কাটানোর সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
উৎসবের শহর এডিনবরায় পর্যটকের ঢল
আগস্ট মাস এডিনবরার জন্য বরাবরই সবচেয়ে ব্যস্ত সময়। এ বছরও শহরের কেন্দ্রস্থল, বিশেষ করে প্রিন্সেস স্ট্রিটে পর্যটকদের ভিড় চোখে পড়ার মতো। ব্যাগপাইপারের সুর, ফ্রিঞ্জ উৎসবের প্রচারক এবং হাজারো দর্শনার্থীর উপস্থিতিতে শহরটি ফিরে পেয়েছে উৎসবের পূর্ণ আমেজ।
স্কটিশ ট্যুরিজম অ্যালায়েন্সের প্রধান নির্বাহী মার্ক ক্রোথালের মতে, এ বছর উৎসবের টিকিট বিক্রি বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। তার ভাষায়, এডিনবরার প্রাণবন্ত উৎসব পরিবেশ আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আকর্ষণের অন্যতম বড় কারণ।
তবে সব পর্যটকই উৎসবকে সামনে রেখে স্কটল্যান্ডে আসছেন না। মেক্সিকো সিটি থেকে আসা পর্যটক জানেত গার্সিয়া স্কটল্যান্ডে এসে তবেই জানতে পারেন এডিনবরা ফ্রিঞ্জের কথা। তার স্কটল্যান্ড ভ্রমণের প্রধান কারণ ছিল দেশটির পুরাণ, ইতিহাস ও জনপ্রিয় সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ।
‘হ্যারি পটার’, ‘আউটল্যান্ডার’ ও অন্যান্য জনপ্রিয় বই, চলচ্চিত্র এবং টিভি সিরিজ স্কটল্যান্ডকে বিশ্বজুড়ে এক বিশেষ কৌতূহলের জায়গায় পরিণত করেছে। গার্সিয়া ইতোমধ্যে জনি ওয়াকার এক্সপেরিয়েন্স ঘুরে দেখেছেন এবং মিলিটারি ট্যাটুর টিকিটও সংগ্রহ করেছেন।
ভিজিটস্কটল্যান্ডের প্রধান নির্বাহী ভিকি মিলারের মতে, আন্তর্জাতিক পর্যটকদের প্রায় ৩৬ থেকে ৩৭ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে চলচ্চিত্র বা টেলিভিশনের দৃশ্য দেখে ভ্রমণে অনুপ্রাণিত হন। ‘ব্রেভহার্ট’ ও ‘লোকাল হিরো’র মতো পুরোনো চলচ্চিত্রও এখনও মানুষের মনে স্কটল্যান্ডের প্রতি আগ্রহ তৈরি করে।
সাম্প্রতিক রিয়েলিটি শো ‘দ্য ট্রেইটরস’-এর জনপ্রিয়তার পর এর প্রধান লোকেশন আর্ড্রস ক্যাসেলকে ঘিরে অনলাইনে অনুসন্ধান বেড়েছে। যদিও ক্যাসেলটি সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত নয়। অন্যদিকে ‘আউটল্যান্ডার’-এ ব্যবহৃত বিভিন্ন দুর্গ ইতোমধ্যেই বিদেশি পর্যটকদের বড় আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।
খেলাধুলাও বাড়াচ্ছে স্কটল্যান্ডের পরিচিতি
শুধু সংস্কৃতি বা চলচ্চিত্র নয়, খেলাধুলাও স্কটল্যান্ডের পর্যটন বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। আন্তর্জাতিক ফুটবল টুর্নামেন্টে স্কটিশ সমর্থকদের বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ, রসিকতা এবং স্থানীয় দাতব্য প্রতিষ্ঠানে অনুদানের মতো কর্মকাণ্ড ‘টারটান আর্মি’র ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করেছে।
বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রে খেলতে গেলে ভিজিটস্কটল্যান্ড বোস্টন শহরকে ঘিরে বিশেষ প্রচারণা চালায়। এর পরপরই স্কটল্যান্ডে ছুটি কাটানো নিয়ে স্থানীয় অনলাইন অনুসন্ধান দ্বিগুণ হয় বলে পর্যটন সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এ ছাড়া গ্লাসগোর কমনওয়েলথ গেমস, বড় গলফ টুর্নামেন্ট এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজনও স্কটল্যান্ডকে সারা বছর পর্যটন গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরতে সাহায্য করছে।
বিদেশিরা বেশি খরচ করলেও মাথাপিছু ব্যয় কমছে
স্কটল্যান্ডে পর্যটকদের বড় অংশ এখনও যুক্তরাজ্যের নাগরিক। তবে বিদেশি পর্যটকেরা তুলনামূলক বেশি সময় থাকেন, বেশি জায়গা ঘোরেন এবং বেশি অর্থ ব্যয় করেন।
২০২৪ সালে একজন বিদেশি পর্যটক স্কটল্যান্ডে এক সপ্তাহে গড়ে ৯০০ পাউন্ডের কিছু বেশি খরচ করেছেন। বিপরীতে একজন ব্রিটিশ পর্যটকের তিন রাতের গড় ব্যয় ছিল ৩০০ পাউন্ডের সামান্য বেশি।
তবে পর্যটকের সংখ্যা বাড়লেও মাথাপিছু ব্যয় কিছুটা কমেছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক ব্রিটিশ পর্যটক বিনামূল্যের জাদুঘর, প্রকৃতি ভ্রমণ ও হাঁটার মতো কম খরচের কার্যক্রম বেছে নিচ্ছেন। রেস্তোরাঁয় তিন কোর্সের খাবারের বদলে এক কোর্সে সীমাবদ্ধ থাকার প্রবণতাও বাড়ছে।
গ্লাসগো ক্যালেডোনিয়ান ইউনিভার্সিটির মফ্যাট সেন্টারের তথ্য বলছে, এ বছর বড় পরিবর্তন দেখা গেছে ভ্রমণের ধরনে। হোটেলে থাকার বদলে ক্যাম্পারভ্যান নিয়ে স্কটল্যান্ড ঘুরে দেখার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
পর্যটন বাড়লেও চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে
পর্যটন খাতের সামগ্রিক পরিস্থিতিকে ‘স্বাস্থ্যকর, কিন্তু মোটেও উল্লম্ফন নয়’ বলে বর্ণনা করেছেন মার্ক ক্রোথাল। তার মতে, মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়তে থাকায় স্কটল্যান্ডকে সতর্ক থাকতে হবে, যাতে অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে দেশটি আন্তর্জাতিক পর্যটকদের নাগালের বাইরে চলে না যায়।
এডিনবরায় জুলাই থেকে চালু হওয়া আবাসনভিত্তিক ৫ শতাংশ পর্যটন করও পর্যটন ব্যবসার ওপর চাপ তৈরি করেছে বলে সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ মনে করছেন। একজন ট্যুর গাইড বলেন, জীবনযাত্রার খরচ ও নতুন কর একসঙ্গে পর্যটক এবং খাতসংশ্লিষ্ট কর্মীদের ব্যয়ের সক্ষমতায় প্রভাব ফেলছে।
তবে চ্যালেঞ্জের মধ্যেও স্কটল্যান্ডের বড় শক্তি তার বৈচিত্র্য। তুলনামূলক শীতল আবহাওয়া, পাহাড়-হ্রদ-দুর্গের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সমৃদ্ধ ইতিহাস, চলচ্চিত্র ও টিভি সিরিজের জনপ্রিয়তা, বিশ্বমানের উৎসব এবং ক্রীড়াপ্রেমী সংস্কৃতি মিলিয়ে দেশটি আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
তীব্র গরম, দাবানল ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় যখন ইউরোপের অনেক গন্তব্য চাপে, তখন স্কটল্যান্ড যেন পর্যটকদের সামনে তুলে ধরছে ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা: শীতল আবহাওয়া, সমৃদ্ধ সংস্কৃতি এবং গল্পে মোড়া এক অনন্য ভ্রমণভূমি।


